০৯ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ০২:৩৮

শিরোনাম
বাজেটেই মিলবে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা: মির্জা ফখরুল হাসনাতের উদ্যোগে দেবিদ্বারের ১৫২ শিক্ষার্থীর সংসদ পরিদর্শন কুমিল্লা বিমানবন্দরের দাবি জানালেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক পাঁচ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের কর ছাড়, সিগারেটে বাড়তে পারে শুল্ক সংসদ গ্রন্থাগার কমিটির ৪ নম্বর সাব-কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত সীমান্তে পুশইন প্রতিহতে শক্ত অবস্থানে বিজিবি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশে অপরাধ কমেছে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিশ্বাসী সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শিরোনাম
বাজেটেই মিলবে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা: মির্জা ফখরুল হাসনাতের উদ্যোগে দেবিদ্বারের ১৫২ শিক্ষার্থীর সংসদ পরিদর্শন কুমিল্লা বিমানবন্দরের দাবি জানালেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক পাঁচ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের কর ছাড়, সিগারেটে বাড়তে পারে শুল্ক সংসদ গ্রন্থাগার কমিটির ৪ নম্বর সাব-কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত সীমান্তে পুশইন প্রতিহতে শক্ত অবস্থানে বিজিবি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশে অপরাধ কমেছে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিশ্বাসী সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

ইভটিজিং সামাজিক অভিশাপের এক নীরব বিস্তার

ইভটিজিং সামাজিক অভিশাপের এক নীরব বিস্তার

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশিত: ০৯ জুন, ২০২৬, ০০:৪৮

বাংলাদেশের সমাজের গভীরে শিকড় গেঁড়ে বসা এক নীরব কিন্তু সর্বনাশা অভিশাপের নাম হলো ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি। বাংলাদেশের এমন কোন মেয়ে বা নারীকে খুঁজে পাওয়া যাবে না , যে কিনা কোনদিন ইভটিজিং এর শিকার হয়নি।এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি প্রকট সামাজিক ব্যাধি যা প্রতিনিয়ত অসংখ্য নারী ও শিশুর জীবনকে বিষিয়ে তুলছে। ইভটিজিংয়ের শিকার নারীরা কেবল শারীরিক বা মৌখিক আক্রমণের শিকার হন না, তারা স্বাধীনতা, আত্মমর্যাদা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের মৌলিক অধিকার থেকেও বঞ্চিত হন। এই অপরাধের বিস্তার এতটাই ব্যাপক যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডি থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, জনবহুল রাস্তা, এমনকি গণপরিবহনেও নারীরা সর্বদা এক অদৃশ্য আতঙ্কের মধ্যে থাকেন। এই নীরব বিস্তার শুধুমাত্র ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত ক্ষতির কারণ নয়, এটি সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং প্রগতির পথে এক বিশাল প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে।

ইভটিজিং, যা সাধারণত 'পথচারী হয়রানি' নামে পরিচিত, এর পরিধি অত্যন্ত বিস্তৃত। এটি কেবল নারীকে লক্ষ্য করে অশ্লীল মন্তব্য করা বা অশালীন অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে: পিছু নেওয়া, উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ধাক্কা দেওয়া বা স্পর্শ করা, সাইবার স্পেসে হয়রানি করা এবং নারীর পোশাক বা চলাফেরা নিয়ে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করা। এছাড়া হকার থেকে শুরু করে রিক্সা চালক নারীকে দেখলে একটু উচ্চস্বরে হর্ণ বাজানো অথবা শিস দেয়া এসব এখন সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ধরনের আচরণ মূলত বখাটে যুবক বা বিকৃত মানসিকতার পুরুষেরা করে থাকে, যাদের মধ্যে নারীর প্রতি সম্মান বা আইনের প্রতি কোনো ভয় কাজ করে না। ইভটিজিংয়ের প্রধান ক্ষেত্রগুলো হলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ, যেখানে তরুণ শিক্ষার্থীরা আক্রমণের সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়। এছাড়া, গণপরিবহন এবং জনবহুল এলাকাতেও হয়রানির ঘটনা ঘটে। নারীরা প্রায়শই ভিড়ের সুযোগ নিয়ে স্পর্শকাতর স্থানে ইচ্ছাকৃতভাবে স্পর্শ করা বা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা শোনার মতো অপ্রীতিকর ঘটনার সম্মুখীন হন। এই নীরব আক্রমণের শিকার নারীরা তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করার সাহস পান না, কারণ তারা জানেন প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

ইভটিজিংয়ের শিকার নারীদের ওপর এর প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, বরং এর প্রধান ক্ষতটি তৈরি হয় মানসিকভাবে হয়রানির শিকার নারী বা মেয়েটি তীব্র মানসিক ট্রমা এবং হতাশায় ভোগেন। তারা ক্রমাগত ভয়, উদ্বেগ, লজ্জা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগতে শুরু করেন। সমাজের চোখে হেয় প্রতিপন্ন হওয়ার ভয়ে তারা নিজেদের চারপাশ থেকে গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। ফলস্বরূপ, তাদের সামাজিক জীবন সীমিত হয়ে পড়ে। ইভটিজিংয়ের কারণে অনেকক্ষেত্রে মেয়েদের শিক্ষা জীবন অকালে ঝরে যায়। অভিভাবকরা তাদের মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ করে দেন বা তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেন। এভাবে ইভটিজিং একটি মেয়ের সকল সম্ভাবনা এবং আকাঙ্ক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করে। সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা হলো, হয়রানি এবং লোকলজ্জার চাপ সহ্য করতে না পেরে অনেক নারী আত্মহত্যার মতো চরম পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। এই আত্মহত্যাগুলো শুধু একটি ব্যক্তিগত জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটায় না, বরং এটি সমাজের চরম ব্যর্থতার প্রতীক। পরিবারও ইভটিজিংয়ের নীরব শিকার হয়, যা পুরো পরিবারের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি দমনের জন্য কঠোর আইন ও বিধিমালা রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর অধীনে এই অপরাধগুলো শাস্তিযোগ্য। এছাড়াও হাইকোর্টের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কমিটি গঠনের বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। তবে আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ইভটিজিংয়ের বিস্তার থামানো যাচ্ছে না। আইনের প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা একটি প্রধান সমস্যা। অভিযোগ দায়ের করার পর তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগা, মামলার গতি ধীর হওয়া এবং বছরের পর বছর ধরে বিচার প্রক্রিয়া চলতে থাকার কারণে ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্তরা প্রভাবশালী মহলের সাথে সখ্যতা থাকার কারণে সহজেই জামিন পেয়ে যায় এবং শাস্তি এড়াতে সক্ষম হয়। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেশি বেপরোয়া করে তোলে। উপরন্তু, সমাজের একটি বড় অংশ ইভটিজিংয়ের শিকার নারীর পোশাক বা আচরণকে দায়ী করে যে 'ভিকটিম ব্লেমিং' করে, তা আইনি প্রক্রিয়ার বাইরেও ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। এই নীরব সামাজিক সম্মতি অপরাধীদের সুরক্ষা দেয় এবং ইভটিজিংকে একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনায় পরিণত করে।

ইভটিজিং নামক এই সামাজিক অভিশাপের নীরব বিস্তার রুখতে হলে প্রয়োজন সমাজের সর্বস্তরে সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এর প্রধান পূর্বশর্ত। ইভটিজিংয়ের প্রতিটি ঘটনাকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে দ্রুততম সময়ে তদন্ত শেষ করে অভিযুক্তদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করা আবশ্যক। পাশাপাশি সামাজিক ও পারিবারিক সচেতনতা সৃষ্টি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার থেকেই ছেলে-মেয়ে উভয়কে নারীর প্রতি সম্মান, সহনশীলতা এবং মূল্যবোধের শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে বাধ্যতামূলকভাবে হাইকোর্টের নির্দেশনা মেনে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও সক্রিয় করতে হবে। ক্যাম্পাসের আশেপাশে নিরাপত্তা জোরদার করতে হবে এবং শিক্ষার্থীদের জন্য যৌন হয়রানি বিষয়ে নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীলতার সাথে ইভটিজিংয়ের ঘটনাগুলো তুলে ধরতে হবে, যাতে অপরাধীরা সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়।

ইভটিজিং এক সামাজিক অভিশাপ যা আমাদের সমাজের মূল কাঠামোকে ক্ষয় করছে। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে একটি জাতি কখনোই তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। এই নীরব বিস্তারকে রুখতে হলে কেবল আইন নয়, প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক পরিবর্তন। প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব হলো এই অভিশাপের বিরুদ্ধে নীরবতা ভেঙে সোচ্চার হওয়া। সমাজকে এই বার্তা দিতে হবে যে, ইভটিজিং কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এর পরিণতি হবে চরম। সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবার এবং সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমেই কেবল সম্ভব প্রতিটি নারীকে নির্ভয়ে, সম্মানের সাথে এবং সমান অধিকার নিয়ে বাঁচতে দেওয়া। এই সামাজিক অভিশাপের অবসান ঘটিয়ে একটি সুস্থ ও প্রগতিশীল সমাজ গঠনের অঙ্গীকার আজ সময়ের দাবি।

লেখক,
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন 
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

আরও পড়ুন