০৯ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ০২:৩৮

শিরোনাম
বাজেটেই মিলবে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা: মির্জা ফখরুল হাসনাতের উদ্যোগে দেবিদ্বারের ১৫২ শিক্ষার্থীর সংসদ পরিদর্শন কুমিল্লা বিমানবন্দরের দাবি জানালেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক পাঁচ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের কর ছাড়, সিগারেটে বাড়তে পারে শুল্ক সংসদ গ্রন্থাগার কমিটির ৪ নম্বর সাব-কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত সীমান্তে পুশইন প্রতিহতে শক্ত অবস্থানে বিজিবি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশে অপরাধ কমেছে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিশ্বাসী সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শিরোনাম
বাজেটেই মিলবে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা: মির্জা ফখরুল হাসনাতের উদ্যোগে দেবিদ্বারের ১৫২ শিক্ষার্থীর সংসদ পরিদর্শন কুমিল্লা বিমানবন্দরের দাবি জানালেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক পাঁচ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের কর ছাড়, সিগারেটে বাড়তে পারে শুল্ক সংসদ গ্রন্থাগার কমিটির ৪ নম্বর সাব-কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত সীমান্তে পুশইন প্রতিহতে শক্ত অবস্থানে বিজিবি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশে অপরাধ কমেছে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিশ্বাসী সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শত দিন: আগুনের বৃত্তে দাঁড়িয়ে বিশ্বের ভবিষ্যৎ

মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের শত দিন: আগুনের বৃত্তে দাঁড়িয়ে বিশ্বের ভবিষ্যৎ

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

প্রকাশিত: ০৯ জুন, ২০২৬, ০০:৪০

মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যেন একশ দিন ধরে ঝুলে আছে আগুনের লাল সূর্য। প্রতিদিন সূর্য ওঠে, আবার অস্ত যায় কিন্তু যুদ্ধের ধোঁয়া সরতে চায় না। মানুষের সভ্যতা যত আধুনিক হয়েছে, যুদ্ধের ভাষাও তত পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় যুদ্ধ মানে ছিল সীমান্তে সৈন্যের মুখোমুখি অবস্থান। এখন যুদ্ধ মানে ড্রোনের গুঞ্জন, ক্ষেপণাস্ত্রের ঝলকানি, সাইবার হামলা, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং কোটি মানুষের মনে জমে থাকা অনিশ্চয়তার ভয়। ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের শততম দিনে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছে, এটি কেবল তিনটি শক্তির যুদ্ধ নয়, এটি আসলে পুরো বিশ্বের স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে এক কঠিন পরীক্ষা। যুদ্ধক্ষেত্র হয়তো মধ্যপ্রাচ্য, কিন্তু এর কম্পন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতি, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভেতর পর্যন্ত।

প্রতিটি যুদ্ধেরই দৃশ্যমান একটি সূচনা থাকে, কিন্তু প্রকৃত কারণগুলো অনেক গভীরে লুকিয়ে থাকে। ইরান ও ইসরায়েলের বৈরিতা নতুন নয়। কয়েক দশক ধরে রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শগত দ্বন্দ্ব দুই দেশকে মুখোমুখি অবস্থানে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত উপস্থিতি এবং আঞ্চলিক ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা। এই সংঘাতের সাম্প্রতিক বিস্ফোরণ হঠাৎ ঘটেনি। দীর্ঘদিনের অবিশ্বাস, প্রক্সি সংঘর্ষ, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগ, আঞ্চলিক আধিপত্যের প্রতিযোগিতা এবং নিরাপত্তা সংকট একসময় এসে সরাসরি সামরিক উত্তেজনায় রূপ নেয়। ফলে যে আগুন আগে সীমিত পরিসরে জ্বলছিল, তা এখন বৃহত্তর যুদ্ধের রূপ ধারণ করেছে।

যুদ্ধের একশ দিনে সবচেয়ে বড় সত্য হলো এখানে প্রকৃত বিজয়ী এখনও কেউ নয়। সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে উভয় পক্ষ নিজেদের সক্ষমতা প্রদর্শনের চেষ্টা করেছে। উন্নত প্রযুক্তির অস্ত্র, দূরপাল্লার হামলা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা বিশ্বকে নতুন করে দেখিয়েছে আধুনিক যুদ্ধের রূপ। কিন্তু সামরিক শক্তির প্রদর্শন কখনোই রাজনৈতিক সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। অর্থনৈতিক দিক থেকে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি বাজার অস্থির হয়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি, সরবরাহ শৃঙ্খলের অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ আন্তর্জাতিক বাজারকে চাপের মুখে ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্ব জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হওয়ায় যুদ্ধের প্রভাব সীমান্তের বাইরে চলে গেছে। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। যুদ্ধের প্রতিটি দিন মানে নতুন মৃত্যু, নতুন বাস্তুচ্যুতি এবং নতুন মানসিক ট্র্যাজেডি। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত করে। যুদ্ধের হিসাব কেবল অস্ত্রের ক্ষয়ক্ষতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না এর সঙ্গে যুক্ত হয় হারিয়ে যাওয়া শৈশব, ভেঙে যাওয়া পরিবার এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশ্ব বিভক্ত হয়ে পড়েছে। কেউ সরাসরি পক্ষ নিয়েছে, কেউ নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করছে, আবার কেউ মধ্যস্থতার ভূমিকা পালনের চেষ্টা করছে। ফলে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের লক্ষণ স্পষ্ট হচ্ছে।

শত দিন পরও কেন যুদ্ধ থামছে না? এর উত্তর খুঁজতে হলে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, নিরাপত্তা উদ্বেগ। প্রতিটি পক্ষই বিশ্বাস করে যে তাদের অস্তিত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির মুখে রয়েছে। ফলে আপসকে তারা দুর্বলতা হিসেবে দেখতে শুরু করে। দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। যুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদী আবেগ বাড়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব অনেক সময় জনগণের সমর্থন ধরে রাখতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। এতে শান্তি উদ্যোগ দুর্বল হয়ে পড়ে। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তির প্রতিযোগিতা। মধ্যপ্রাচ্য কেবল একটি ভূগোল নয় এটি বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্র। এখানে প্রভাব বিস্তারকে ঘিরে বহু দেশের কৌশলগত স্বার্থ জড়িয়ে আছে। চতুর্থত, অবিশ্বাসের গভীর সংকট। শান্তি আলোচনার জন্য ন্যূনতম আস্থার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের সংঘাত সেই আস্থাকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। ফলে আলোচনার টেবিলে বসার সুযোগ তৈরি হলেও তা দ্রুত ভেঙে পড়ার ঝুঁকি থাকে। এই যুদ্ধ আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা মনে করিয়ে দিয়েছে আজকের পৃথিবীতে কোনো সংঘাত আর স্থানীয় থাকে না। মধ্যপ্রাচ্যে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হলে তার প্রতিফলন দেখা যায় এশিয়ার বাজারে, ইউরোপের জ্বালানি নীতিতে এবং আফ্রিকার খাদ্য নিরাপত্তায়। বিশ্বায়নের যুগে অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও কূটনীতি এমনভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত যে একটি অঞ্চলের অস্থিরতা পুরো বিশ্বকে প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা। জ্বালানি মূল্য, আমদানি ব্যয়, বৈদেশিক বাণিজ্য এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর এ ধরনের সংঘাতের সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব পড়ে।

যুদ্ধের ইতিহাস বলে, শেষ পর্যন্ত প্রায় সব সংঘাতই আলোচনার টেবিলে গিয়ে শেষ হয়। কত প্রাণহানির পর সেই টেবিলের প্রয়োজনীয়তা সবাই উপলব্ধি করবে? সমাধানের প্রথম শর্ত হলো অবিলম্বে উত্তেজনা হ্রাস এবং কার্যকর যুদ্ধবিরতি। এরপর প্রয়োজন আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় একটি বিশ্বাসযোগ্য সংলাপ প্রক্রিয়া। দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা উদ্বেগ নিয়ে বাস্তবভিত্তিক আলোচনা করতে হবে। কোনো পক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ জরুরি। মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা কেবল একটি দেশের দায়িত্ব নয় এটি পুরো অঞ্চলের যৌথ স্বার্থ। চতুর্থত, মানবিক বিষয়কে রাজনৈতিক হিসাবের বাইরে রাখতে হবে। সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষা এবং মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে।

একশ দিনের এই যুদ্ধ আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে। আধুনিক সভ্যতা প্রযুক্তিতে যতই এগিয়ে যাক, রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং পারস্পরিক বিশ্বাসের সংকট থাকলে যুদ্ধের আগুন নিভে না। আজ মধ্যপ্রাচ্য যেন এক বিশাল মরুভূমি, যেখানে প্রতিটি বিস্ফোরণ বালুকণার মতো ছড়িয়ে দিচ্ছে অনিশ্চয়তা। প্রশ্ন হলো, আগামী একশ দিন পর বিশ্ব কি আরও বড় সংঘাতের মুখোমুখি হবে, নাকি শান্তির দিকে প্রথম পদক্ষেপ নিতে পারবে? এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো সামরিক শক্তি ভয় সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী নিরাপত্তা তৈরি করতে পারে না। অস্ত্র যুদ্ধ শুরু করতে পারে, কিন্তু শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। শান্তির ভিত্তি গড়ে ওঠে সংলাপ, আস্থা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ওপর। সেই উপলব্ধি যত দ্রুত আসবে, তত দ্রুত আগুনের এই বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে মধ্যপ্রাচ্য এবং স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারবে বিশ্ব।

লেখক,

নুসরাত জাহান স্মরনীকা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইলঃ [email protected]

আরও পড়ুন