০৯ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার, ০২:৪৪

শিরোনাম
বাজেটেই মিলবে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা: মির্জা ফখরুল হাসনাতের উদ্যোগে দেবিদ্বারের ১৫২ শিক্ষার্থীর সংসদ পরিদর্শন কুমিল্লা বিমানবন্দরের দাবি জানালেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক পাঁচ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের কর ছাড়, সিগারেটে বাড়তে পারে শুল্ক সংসদ গ্রন্থাগার কমিটির ৪ নম্বর সাব-কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত সীমান্তে পুশইন প্রতিহতে শক্ত অবস্থানে বিজিবি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশে অপরাধ কমেছে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিশ্বাসী সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
শিরোনাম
বাজেটেই মিলবে নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা: মির্জা ফখরুল হাসনাতের উদ্যোগে দেবিদ্বারের ১৫২ শিক্ষার্থীর সংসদ পরিদর্শন কুমিল্লা বিমানবন্দরের দাবি জানালেন সংসদ সদস্য মনিরুল হক পাঁচ বছরে বাণিজ্য ঘাটতি বেড়েছে ২৪.১৬ বিলিয়ন ডলার: বাণিজ্যমন্ত্রী নতুন বাজেটে ফ্রিল্যান্সারদের কর ছাড়, সিগারেটে বাড়তে পারে শুল্ক সংসদ গ্রন্থাগার কমিটির ৪ নম্বর সাব-কমিটির দ্বিতীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত সীমান্তে পুশইন প্রতিহতে শক্ত অবস্থানে বিজিবি: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী দেশে অপরাধ কমেছে, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালনে বিশ্বাসী সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

শত দিন পরবর্তী বিএনপি সরকার: প্রতিশ্রুতির পথ নাকি প্রশ্নের পাহাড়?

শত দিন পরবর্তী বিএনপি সরকার: প্রতিশ্রুতির পথ নাকি প্রশ্নের পাহাড়?

নুসরাত জাহান স্মরনীকা

প্রকাশিত: ০৯ জুন, ২০২৬, ০০:৪৩

রাজনীতির সময়কে ক্যালেন্ডারের পাতায় মাপা যায়, কিন্তু একটি সরকারের সাফল্য বা ব্যর্থতাকে মাপা যায় মানুষের জীবনের পরিবর্তনে। একশ দিন খুব বড় সময় নয়, আবার খুব ছোটও নয়। এটি এমন একটি সময়, যখন নতুন সরকারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবতার সঙ্গে প্রথমবারের মতো মুখোমুখি হয়। একশ দিনের মাথায় একটি সরকারকে ঘিরে মানুষের মূল্যায়ন অনেকটা সকালের আকাশ দেখার মতো। সূর্য পুরোপুরি ওঠেনি, আবার রাতও শেষ হয়ে গেছে। আলো কতটা আসবে, তা তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয় কিন্তু দিগন্তের রং দেখে ভবিষ্যতের কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

সরকার পরিবর্তনের পর সাধারণত জনগণের প্রত্যাশা থাকে অর্থনীতিতে স্বস্তি, বাজারে স্থিতিশীলতা, নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতি আসবে। কিন্তু কোনো সরকারের প্রথম কয়েক মাস প্রায়ই সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে ওঠে। কারণ তখন নতুন নীতির বাস্তবায়ন শুরু হয়, পুরোনো সমস্যার দায় সামনে আসে এবং জনগণের প্রত্যাশা সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস এবং জ্বালানি তেলের মূল্য। নাগরিক জীবনের প্রতিটি স্তরের সঙ্গে এই খাতগুলোর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। একটি পরিবারের রান্নাঘর থেকে শুরু করে একটি শিল্পকারখানার উৎপাদন পর্যন্ত সবকিছুই জ্বালানি খরচের ওপর নির্ভরশীল। যখন বিদ্যুৎ বা জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন সেটি কেবল একটি খাতকে প্রভাবিত করে না। পরিবহন ব্যয় বাড়ে, উৎপাদন খরচ বাড়ে, বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এর চাপ গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের পকেটে। এই কারণেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে চলে আসে।

রাজনীতিতে সংখ্যা খুব শক্তিশালী অস্ত্র। একটি পক্ষ সংখ্যা দেখিয়ে ব্যর্থতা প্রমাণ করতে চায়, অন্য পক্ষ একই সংখ্যা ব্যাখ্যা করে প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে। যদি কোনো সরকার বিদ্যুৎ, গ্যাস বা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করে, তাহলে প্রশ্ন ওঠে, কেন? সমর্থকদের যুক্তি হতে পারে, দীর্ঘদিনের ভর্তুকির চাপ কমানো, রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি পুনর্গঠন অথবা আন্তর্জাতিক বাজারের বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করার প্রয়োজন ছিল। অন্যদিকে সমালোচকরা বলবেন, অর্থনৈতিক সংস্কারের বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপানো হয়েছে। সত্যটা অনেক সময় মাঝখানে থাকে। অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন হতে পারে, কিন্তু সেই সংস্কারের সামাজিক মূল্য কতটা, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সাধারণ মানুষ তার সুফল অনুভব করতে পারে।

একটি সরকারের জনপ্রিয়তা নির্ধারণে অর্থনীতির পাশাপাশি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিরাপত্তা। একজন নাগরিক যখন ঘর থেকে বের হন, তখন তার প্রথম প্রত্যাশা থাকে নিরাপদে ফিরে আসার। রাষ্ট্রের মূল দায়িত্বগুলোর মধ্যে এটিই অন্যতম। সাম্প্রতিক সময়ে হত্যা, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন এবং সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। এসব ঘটনায় জনমনে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ অর্থনৈতিক কষ্ট মানুষ কিছুটা সহ্য করতে পারে, কিন্তু নিরাপত্তাহীনতা দীর্ঘমেয়াদে সমাজের ভেতরের আস্থা নষ্ট করে দেয়। তবে অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কোনো সরকারের শত দিনের তথ্য দিয়ে পুরো পরিস্থিতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা সবসময় সম্ভব হয় না। কারণ অপরাধের প্রবণতা, বিচারিক প্রক্রিয়া, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কার্যক্রম এবং সামাজিক বাস্তবতা সবকিছু মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি হয়। তারপরও জনগণের কাছে বার্তাটি স্পষ্ট অপরাধ কমাতে দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চায় মানুষ।

গণতন্ত্রে বিরোধী পক্ষের কাজই হলো সরকারের কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করা। তারা সরকারের দুর্বলতা তুলে ধরবে, ব্যর্থতার হিসাব দেবে এবং বিকল্প পথ দেখাবে। অন্যদিকে সরকারের দায়িত্ব হলো সমালোচনার জবাব তথ্য, কার্যক্রম এবং ফলাফল দিয়ে দেওয়া। এই দ্বন্দ্বই গণতন্ত্রের প্রাণ। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন রাজনৈতিক বিতর্ক তথ্যের চেয়ে আবেগনির্ভর হয়ে পড়ে। তখন মানুষ প্রকৃত চিত্রের বদলে বিভক্ত বয়ানের মধ্যে আটকে যায়। একশ দিনের মূল্যায়নে তাই প্রয়োজন রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বাস্তব তথ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ।

একশ দিনের অভিজ্ঞতা থেকে সরকারের জন্য কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রথমত, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে জনগণের সঙ্গে আরও কার্যকর যোগাযোগ প্রয়োজন। মানুষ শুধু মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণা শুনতে চায় না, কেন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো এবং এর সুফল কী হবে, সেটিও জানতে চায়। দ্বিতীয়ত, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। অপরাধের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও দ্রুত পদক্ষেপ জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। তৃতীয়ত, বাজার নিয়ন্ত্রণ ও দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি। কারণ সাধারণ মানুষ সরকারের সাফল্য বিচার করে মূলত নিজের দৈনন্দিন জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে। চতুর্থত, রাজনৈতিক সহনশীলতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। একটি দেশ তখনই এগোয়, যখন সরকার ও বিরোধী পক্ষ প্রতিযোগিতা করে উন্নয়ন ও নীতির ভিত্তিতে, কেবল সংঘাতের ভিত্তিতে নয়।

একশ দিন কোনো সরকারের পূর্ণ মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়, কিন্তু দিকনির্দেশনা বোঝার জন্য যথেষ্ট। এটি অনেকটা নদীর উৎসের মতো সেখানে দাঁড়িয়ে পুরো নদীর গন্তব্য দেখা যায় না, কিন্তু প্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে, তার ধারণা পাওয়া যায়। বিএনপি সরকারের প্রথম একশ দিনকে ঘিরে যে আলোচনা, সমালোচনা এবং বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আসলে একটি বড় সত্যের প্রতিফলন জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, অনেক বেশি প্রত্যাশী। সরকারের জন্য এটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় সুযোগ। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত প্রচারণা দিয়ে লেখা হয় না, ইতিহাস লেখা হয় মানুষের জীবন কতটা সহজ হলো, কতটা নিরাপদ হলো এবং কতটা আশাবাদী হলো সেই হিসাব দিয়ে। আর সেই হিসাবের খাতা এখনও খোলা আছে। একশ দিনের পর প্রকৃত প্রশ্ন হলো, আগামী দিনগুলোতে সেই খাতায় কী লেখা হবে।
 

লেখক,

নুসরাত জাহান স্মরনীকা
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইলঃ[email protected]

আরও পড়ুন