২৪ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, ০৩:০৯

শিরোনাম
থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দেশে ফিরছেন স্পিকার পদত্যাগের প্রসঙ্গে যা বললেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করেছে সফল বাস্তবায়নের উপর: অর্থমন্ত্রী পদত্যাগের পরই রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতার দাবি জানান নাহিদ আগামীকাল বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে ভোলার যেসব এলাকায় শনিবার নভোথিয়েটারে সেমিকন্ডাক্টর সামিটের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গাপুরে হাসপাতালে ভর্তি ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ নৌবাহিনীর ১৮তম প্রধান হলেন খোন্দকার মিসবাহ
শিরোনাম
থাইল্যান্ড সফর সংক্ষিপ্ত করে আজ দেশে ফিরছেন স্পিকার পদত্যাগের প্রসঙ্গে যা বললেন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বাজেটের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করেছে সফল বাস্তবায়নের উপর: অর্থমন্ত্রী পদত্যাগের পরই রাষ্ট্রপতিকে গ্রেফতার দাবি জানান নাহিদ আগামীকাল বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকবে ভোলার যেসব এলাকায় শনিবার নভোথিয়েটারে সেমিকন্ডাক্টর সামিটের উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী সিঙ্গাপুরে হাসপাতালে ভর্তি ধর্মমন্ত্রী কায়কোবাদ নৌবাহিনীর ১৮তম প্রধান হলেন খোন্দকার মিসবাহ

বাঙালি ঐতিহ্যের অন্তিম প্রহর

বাঙালি ঐতিহ্যের অন্তিম প্রহর

জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন

প্রকাশিত: ০৮ জুন, ২০২৬, ০১:১৫

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে মিশে আছে মাটির সোঁদা গন্ধ, সুঁই-সুতোর কারুকাজ আর বাঁশ-বেতের নিপুণ বুনন। নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প কিংবা বেতের কাজ কেবল পণ্য নয়, এগুলো ছিল এ দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির প্রধান ধারক। কিন্তু কালের বিবর্তনে, যান্ত্রিকতার দাপটে আর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আজ এই শিল্পগুলো ধুঁকছে। প্লাস্টিক, মেলামাইন আর সিন্থেটিক পণ্যের সস্তা জোয়ারে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের শৈল্পিক পরিচয়, আর এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা হাজার হাজার কারিগরের জীবন এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে। এক সময় গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে নকশিকাঁথা তৈরির যে ধুম ছিল, তা আজ কেবল স্মৃতি। জসীমউদ্দীনের কাব্যে যে বিরহ আর প্রেমের আখ্যান ফুটে উঠত সুঁই-সুতোর ফোঁড়ে, সেই শিল্প আজ বিপন্ন। হাতে সেলাই করা একটি মানসম্মত নকশিকাঁথা তৈরি করতে মাসখানেক সময় লাগে, কিন্তু পাইকারি বাজারে এর উপযুক্ত দাম নেই। ফলে যশোর বা জামালপুরের দক্ষ কারিগররা পেটের দায়ে পৈতৃক পেশা ছেড়ে পোশাক কারখানায় শ্রমিকের কাজ বেছে নিচ্ছেন। সুঁই-সুতোর সেই নিপুণ ছোঁয়ায় এখন আর নতুন কোনো স্বপ্ন বোনা হয় না; বরং দারিদ্র্যের কষাঘাতে ফিকে হয়ে যাচ্ছে নকশার রঙ।

একই করুণ দশা বিরাজ করছে কুমার পাড়াগুলোতে। মৃৎশিল্পের প্রধান উপকরণ আঠালো মাটি ও জ্বালানি কাঠ এখন দুর্মূল্য। নগরায়নের ফলে ফসলি জমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় মৃৎশিল্পীরা মাটি সংকটে ভুগছেন। এক সময় বাঙালির রান্নাঘর মাটির হাঁড়ি, কলস আর সরা ছাড়া কল্পনা করা যেত না, কিন্তু এখন এলুমিনিয়াম আর সিরামিকের দাপটে চাকা ঘোরে না কুমারদের ঘরে। সাভারের ধামরাই বা পটুয়াখালীর পাল পাড়াগুলোতে গেলে দেখা যায়, মাটির স্তূপ পড়ে আছে কিন্তু কারিগর নেই। তরুণ প্রজন্ম বাবার আদি পেশা ছেড়ে রিকশা চালানো বা দিনমজুরি করছে কারণ শিল্পী সত্তা দিয়ে পেট ভরে না। অন্যদিকে, বাঁশ ও বেতের শিল্পও প্লাস্টিকের আগ্রাসনে কোণঠাসা। কুলা, ডালা, চালনি কিংবা বেতের সোফা এক সময় আভিজাত্যের প্রতীক থাকলেও এখন বনাঞ্চল উজাড় হওয়ায় কাঁচামাল পাওয়া দুষ্কর। সিলেটের বিখ্যাত বেত শিল্প কিংবা উত্তরবঙ্গের বাঁশ শিল্প এখন কেবল প্রদর্শনীর বস্তু হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাইকারি বাজারে একটি হাতে বোনা কুলার চেয়ে প্লাস্টিকের কুলার দাম অনেক কম হওয়ায় সাধারণ মানুষ সস্তার পেছনে ছুটছে, ফলে হারিয়ে যাচ্ছে নিপুণ হাতের কারুকাজ।

এই সংকটের মূলে রয়েছে আধুনিক বাজার ব্যবস্থার সঙ্গে ঐতিহ্যের অসম লড়াই। একটি মেশিনে কয়েক মিনিটে যে নকশা তৈরি হয়, একজন কারিগর তা হাত দিয়ে করতে কয়েক দিন সময় নেন। এই শ্রমের মূল্য নির্ধারণ করার মতো সংবেদনশীলতা বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। বিপণন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন না হওয়ায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে শিল্পীরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে। সরকারিভাবে সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিক প্রশিক্ষণের অভাব এই শিল্পকে আরও অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। অথচ নকশিকাঁথা, মৃৎশিল্প বা বেতের কাজ কেবল কয়েক টুকরো বাঁশ বা মাটি নয়; এগুলো আমাদের শেকড়। এই কারিগররা যদি অভাবের তাড়নায় পেশা ছেড়ে দেন, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কেবল জাদুঘরেই এসবের দেখা পাবে। একটি জাতি হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হলো দেশীয় পণ্য ব্যবহার করা এবং এই শিল্পীদের ন্যায্য সম্মান প্রদান করা। আজ যদি আমরা প্লাস্টিক বর্জন করে মাটির পাত্র ব্যবহার করি কিংবা ঘরে হস্তশিল্পের ছোঁয়া রাখি, তবে তা কেবল শৌখিনতা নয়, বরং একটি বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকে নতুন করে জীবনদান করা হবে। কারুশিল্পীদের জীবনসংগ্রাম আসলে আমাদের সংস্কৃতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, যেখানে তাদের জয়ী করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক,
জান্নাতুল ফেরদৌস জেরিন 
শিক্ষার্থী, বাংলা বিভাগ 
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 

আরও পড়ুন