আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রযুক্তির আধিপত্য
আব্দুল্লাহ আল সাউদ
প্রকাশিত: ০৮ জুন, ২০২৬, ০১:০৫
মানব ইতিহাসে বিশ্বের ক্ষমতায় কখনো কেউ একক আধিপত্য ধরে রাখতে পারেনি। তবে ইতিহাসে এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে যেখানে কালক্রমে অনেক জাতি বা সম্রাজ্য পৃথিবীর বড় একটি অংশে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। কিন্তু বর্তমানে সেই সামরিক ক্ষমতা ও অস্ত্রের বলে যুদ্ধ করে রাজ্যের পর রাজ্য দখল করে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করার যুগ নেই। সময়ের পরিক্রমে মানবজাতি এখন সভ্যতার এক অনন্য চূড়ায় পৌছেছে। যেখানে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনার নীতিতে এসেছে ঢেড় পরিবর্তন।
মানব সভ্যতার শুরু থেকে বর্তমান আধুনিক সভ্যতা পর্যন্ত একটি বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে। সেটি হলো ক্ষমতায়ন। মানব সভ্যতার ইতিহাস ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও আধিপত্য বিস্তারের ইতিহাস। কিন্তু এই ক্ষমতার কিছু মানদণ্ড রয়েছে। এবং এই মানদণ্ড গুলো পরিবর্তনশীল। যুগে যুগে ক্ষমতায়নের নির্ধারক কিংবা মানদণ্ডগুলো সময়ের সাপেক্ষে পরিবর্তন হয়ে আসছে।
উদাহরণস্বরূপ, সভ্যতার আদিকালে মানুষের প্রধান কাজ ছিল শিকার ও কৃষিকাজ। এমতাবস্থায়, যারা পাথরের অস্ত্র তৈরিতে পারদর্শী, অস্ত্র চলানো ও শিকারে পারদর্শী এবং দৈহিক শক্তিধর তাদেরই ক্ষমতাবান বলে মনে করা হতো। সুতরাং, সে সময়ে ক্ষমতার মানদণ্ড ছিল শারীরিক শক্তি এবং শিকারে পারদর্শীতা।
অতঃপর মানব সভ্যতার বিকাশ ঘটে এবং তার সাথে জটিল হয়ে পরে বিশ্ব রাজনীতি। আবিষ্কার হয় রাজতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র। সামরিক ক্ষমতায়নেরও বিকাশ ঘটে। পৃথিবীজুড়ে নানান সভ্যতার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এবং প্রত্যেকেই আধিপত্য বিস্তারের প্রচেষ্টায় থাকে। রাজা তার সৈন্যদের নিয়ে যুদ্ধে যেত এবং নিজ সম্রাজ্যকে বিকশিত করত। যে সম্রাজ্যের সামরিক ক্ষমতা বেশি সেই বিশ্বকে শাসন করেছে। এভাবেই মধ্যযুগে ক্ষমতার মানদণ্ড ছিল সামরিক শক্তি ও রণকৌশল।
এখন যদি আমরা আধুনিক সভ্যতার দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাই যে রাজনৈতিক প্রাঙ্গণে জটিলতা আরও অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই আধুনিক সভ্যতায় ক্ষমতার নির্ধারক কী? উত্তর হলো- প্রযুক্তি। আমরা যদি বিগত দুইশত বছরের ইতিহাস দেখি তাহলে দেখতে পাই যে, হাজার হাজার বছর ধরে মানব সভ্যতার যা বিকাশ ঘটেছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি আধুনিকতার ছোয়া পৃথিবী বিগত দুইশত বছরে পেয়েছে। আর এর পিছনে সবচেয়ে বড় অবদান রয়েছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির। আধুনিক যুগের সূচনায় সমগ্র বিশ্ব পরপর দুটি বিশ্বযুদ্ধের সাক্ষী হয়। আর এই বিশ্বযুদ্ধগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে প্রযুক্তি। বিশ্বযুদ্ধে যে দেশ প্রযুক্তির সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করতে পেরেছে সেই দেশই সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আমেরিকা উন্নত মানের যুদ্ধ বিমান, যুদ্ধ জাহাজ ও হাইটেক অস্ত্র ব্যাবহার করে। সবশেষে পারমাণবিক অস্ত্র দিয়ে আমেরিকা পুরো বিশ্বকে দেখিয়ে দেয় প্রযুক্তি ও মানুষের চাহিদা একত্রিত হলে তা কত ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্বনীতিতে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। বলতে গেলে এখানে দিনশেষে জয় হয়েছে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানের। বর্তমান সময়ে বিশ্ব রাজনীতিতে লক্ষ্য করলে আমরা দেখতে পাই, আমেরিকা, রাশিয়া, চীন ও জাপান ইত্যাদি প্রযুক্তিগত উন্নত দেশগুলোই বিশ্বে আধিপত্য ধরে রেখেছে।
সামরিক দিক থেকে যদি দেখি তাহলে উন্নত মানের এয়ার ক্রাফ্ট, যুদ্ধ জাহাজ, সাবমেরিনসহ অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র যেমন- হাইপারসনিক মিসাইল, ব্যালেস্টিক মিসাইল এছাড়া রয়েছে ভয়াবহ পারমাণবিক অস্ত্র ইত্যাদি অনেক ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এবং যে সকল দেশ প্রযুক্তিকে এ ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পেরেছে তারাই আজ সামরিক ক্ষমতার দিক থেকে সমগ্র বিশ্বে শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে।
আধুনিক বিশ্বে কেবল সামরিক ক্ষমতা থাকলেই সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্র হওয়া যায় না। বর্তমান যুগে ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হলো বাণিজ্য। আর প্রযুক্তি হলো বাণিজ্যিক খাতে আধিপত্য বিস্তার করার সবচেয়ে সহজ উপায়। বিগত কয়েক দশকে পৃথিবীতে অনেক প্রযুক্তি ভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে যেমন- মাইক্রোসফট, অ্যাপল, মেটা ইত্যাদি এগুলো হলো সফটওয়্যার ভিত্তিক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও রয়েছে অনেক মোবাইল ফোন ব্র্যান্ড, গাড়ির ব্র্যান্ড ও অন্যান্য প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্যক প্রতিষ্ঠান। আমরা বিশ্ব অর্থনীতিতে নজর দিলে দেখতে পাই বিশ্বের সবচেয়ে মুনাফা অর্জনকারী বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো হচ্ছে অ্যাল্ফাবেট, এনভিডিয়া, অ্যাপল, মাইক্রোসফট ও অ্যামাজন যেগুলো সবগুলোই আন্তর্জাতিক পর্যায়ের টেক জায়ান্ট। সুতরাং, বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রযুক্তি নির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলোই প্রভাবশালী ভূমিকা রাখছে। এবং যেসকল দেশ প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে তারাই বিশ্ব অর্থনীতি ও বাণিজ্যকে আয়ত্ত করে রেখেছে।
ইন্টারনেট প্রযুক্তির আরো একটি চমৎকার উদ্ভাবন। যার সাহায্যে পুরো পৃথিবীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব। আর এই ইন্টারনেটের উপর যদি কোনো দেশ একক আয়ত্ত প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয় তাহলে পুরো পৃথিবীর সামনে নিজস্ব ন্যারেটিভ প্রচার করাও সহজ হয়ে যায়। যাতে করে অনলাইন ভিত্তিক মিডিয়ার একটি বৃহদাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে যাদের কাছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ থাকে। উপরোক্ত আলোচনা থেকে বলা যায়, বর্তমান যুগ অর্থাৎ আধুনিক যুগের ক্ষমতার মানদণ্ড হলো প্রযুক্তি।
আর প্রযুক্তি নির্ভর এই বিশ্বে আরো একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে এ.আই (আর্টিফিশিয়াল ইন্ট্যালিজেন্স)। এ.আই এর হাত ধরে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও উদ্ভাবনার জন্য এক অন্যতম পরিসর বিকশিত হয়েছে। সকল এমনকি মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এ.আই এর ব্যাবহার অত্যাধিক বেড়ে গিয়েছে। মোবাইল ফোন থেকে শুরু করে যানবাহন, বৈজ্ঞানিক রিসার্চ ল্যাবে এ.আই এর ব্যাবহার লক্ষনীয়। এমনকি অস্ত্র তৈরি ও পরিচালনায়ও এ.আই সংযুক্ত হয়ে গিয়েছে। এবং এখান থেকে বলা যায় যে আগামীর বিশ্বে এ.আই হতে যাচ্ছে ক্ষমতার নতুন মানদণ্ড।
লেখক,
আব্দুল্লাহ আল সাউদ
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
আরও পড়ুন
- • জুনের ৬ দিনে এলো ৬৮ কোটি ডলার রেমিট্যান্স
- • ১৬ দেশের লড়াইয়ে সেরা বাংলাদেশের ‘টিম ফ্যান্টম ফোর্জ’
- • স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট হতে পারে শিক্ষার্থীদের জন্য আশির্বাদ
- • বাঙালি ঐতিহ্যের অন্তিম প্রহর
- • ধর্ষণের পর ভুক্তভোগীর সামাজিক লড়াই
- • আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রযুক্তির আধিপত্য
- • শিল্প বিপ্লবের নতুন ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব
- • শহরের বিষাক্ত বাতাসে বাড়ছে শ্বাসকষ্টের রোগী
- • ফ্রিল্যান্সারদের আয়ে থাকছে না সাড়ে সাত শতাংশ কর
- • রেলপথে নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে ছিনতাই, প্রাণ সংশয়ে যাত্রীরা
- • বাংলাদেশ–তুরস্ক সাংস্কৃতিক সহযোগিতায় নতুন অধ্যায়, স্বাক্ষরিত হলো সমঝোতা স্মারক
- • ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাশেই মিলবে মশা দমনের শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রী
- • জানা গেলো মৃত নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক কন্যার পরিচয়
- • বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্বর্ণের দামে নতুন প্রভাব
- • ৫ দিনের বৃষ্টির খবর দিল আবহাওয়া অফিস
- • পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
- • বাকস্বাধীনতা কোথায়?
- • প্রশাসনে বড় রদবদল, সাত অতিরিক্ত সচিবকে নতুন দায়িত্ব
