উৎসবের শহরে অবহেলিত পথশিশু
কলাম লেখক
প্রকাশিত: ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০০:২৭
রমজান এলে আমাদের চারপাশ বদলে যায়। বাজারে বাড়তি ভিড়, ঘরে ঘরে ইফতারের প্রস্তুতি, নতুন পোশাক কেনার আনন্দ, মসজিদমুখী মানুষের ঢল- সব মিলিয়ে এক উৎসবমুখর আবহ তৈরি হয়। ঢাকার ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে দেশের ছোট শহরগুলো পর্যন্ত রমজানের ছোঁয়ায় বদলে যায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা। ইফতারের আগে রাস্তা জুড়ে খাবারের দোকান, টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাজানো টেবিলের ছবি; সবকিছুই যেন জানিয়ে দেয়, এটি আলাদা এক মাস। কিন্তু এই বদলে যাওয়া পৃথিবীতে একটি শ্রেণি থেকে যায় প্রায় অদৃশ্য, 'পথশিশুরা'।
রমজান এলে আমরা ভালো খাবার খাই, পরিবারের সঙ্গে বসে ইফতার করি, আত্মীয়স্বজনের দাওয়াতে যাই। অনেক পরিবারে ইফতার আয়োজন দিন দিন বড় হয়। অথচ শহরের ফুটপাতে বসবাসকারী শিশুর জীবনে এই আয়োজনের খুব সামান্যই প্রতিফলন ঘটে। কেউ হয়তো একদিন কোনো স্বেচ্ছাসেবী দলের দেওয়া ইফতার পায়, কেউ বা কোনো পথচারীর দয়ায় একটি খাবারের প্যাকেট হাতে পায়। কিন্তু সেটি নিয়ম নয়, নিশ্চয়তাও নয়। অধিকাংশ দিনের মতো রমজানেও তাদের প্রধান প্রশ্ন থাকে, আজ রাতে খাবার মিলবে তো?
রমজানের মূল শিক্ষা সংযম ও সহমর্মিতা। আমরা রোজা রেখে ক্ষুধার কষ্ট অনুভব করি, যেন বুঝতে পারি অভাবীদের বাস্তবতা। কিন্তু যে শিশুটি সারা বছর অপুষ্টিতে ভোগে, যার কাছে দুই বেলা খাবারই অনিশ্চিত, তার কাছে ক্ষুধা কোনো আধ্যাত্মিক অনুশীলন নয়, এটি নির্মম বাস্তবতা। আমাদের কাছে রোজা একটি নির্দিষ্ট সময়ের ইবাদত; তাদের কাছে না খাওয়া একটি দৈনন্দিন অভ্যাস, যা তারা বেছে নেয়নি।
রমজান উপলক্ষে শহর নতুন রূপে সেজে ওঠে। আলোকসজ্জা, ব্যানার, ছাড়ের অফার, ঈদের কেনাকাটার উন্মাদনা- সব মিলিয়ে আনন্দের বহিঃপ্রকাশ স্পষ্ট। কিন্তু সেই রঙিন আবহ পথশিশুর জীবনে লাগে না। তারা দেখে, কিন্তু অংশ নিতে পারে না। তারা এই উৎসবের প্রান্তিক দর্শক। তাদের পোশাক পুরোনোই থাকে, তাদের আশ্রয় থাকে ফুটপাত বা বস্তির অস্থায়ী ঘর, তাদের ভবিষ্যৎ থাকে অনিশ্চয়তায় ঢাকা।
পথশিশুদের এই বঞ্চনার পেছনে রয়েছে জটিল সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। দারিদ্র্য, পারিবারিক ভাঙন, গ্রাম থেকে শহরে অভিবাসন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ- সব মিলিয়ে অনেক শিশু পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে থাকায় তারা দ্রুত শ্রমে জড়িয়ে পড়ে। কেউ প্লাস্টিক কুড়ায়, কেউ গাড়ির কাঁচ মুছে, কেউ ছোটখাটো কাজ করে দিন কাটায়। স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা তাদের নাগালের বাইরে থাকে। ফলে তারা শারীরিক ও মানসিক ঝুঁকির মধ্যে বড় হয়।
রমজানে আমরা দান করি- যাকাত, ফিতরা, সদকা। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। কিন্তু যদি এই দান কেবল একবেলার খাবারেই সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সমস্যার মূল সমাধান নয়। পথশিশুরা দয়া চায় না; তারা চায় সুযোগ। তারা চায় স্কুলে যাওয়ার অধিকার, নিরাপদ আশ্রয়, চিকিৎসা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন। সাময়িক সহায়তা তাদের ক্ষুধা মেটাতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না।
এখানেই আসে দায়িত্বের প্রশ্ন। রাষ্ট্রের উচিত পথশিশুদের জন্য কার্যকর ও সমন্বিত নীতি গ্রহণ করা; যাতে পুনর্বাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হয়। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও করপোরেট খাতেরও ভূমিকা আছে। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা প্রকল্প, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ ও আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়েও উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, মাসে একজন শিশুর পড়াশোনার দায়িত্ব নেওয়া, বিশ্বস্ত সংগঠনের মাধ্যমে নিয়মিত সহায়তা করা, কিংবা নিজের আশপাশের বঞ্চিত শিশুদের জন্য স্থায়ী কোনো পরিকল্পনা করা।
রমজান আমাদের আত্মসমালোচনার সুযোগ দেয়। আমরা কি কেবল নিজের ইবাদতে সন্তুষ্ট, নাকি সমাজের প্রান্তিক মানুষের অধিকার নিয়েও ভাবি? ইফতারের টেবিলে প্রাচুর্য আর ফুটপাতে অনাহারের সহাবস্থান আমাদের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যদি রমজানের শিক্ষা সত্যিই ধারণ করতে চাই, তবে আমাদের সহমর্মিতা হতে হবে ধারাবাহিক, কেবল আবেগনির্ভর নয়।
রমজান শেষ হয়ে যাবে, ঈদের আনন্দও কেটে যাবে। কিন্তু পথশিশুর জীবনের সংগ্রাম চলতেই থাকবে। তাই প্রয়োজন এমন উদ্যোগ, যা মাসভিত্তিক নয়, বরং বছরজুড়ে কার্যকর। একটি শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া, তাকে নিরাপদ ঘুমের জায়গা নিশ্চিত করা, তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা- এসবই রমজানের প্রকৃত চেতনার বাস্তব রূপ।
যেদিন রমজানের আলো কেবল আলোকসজ্জায় নয়, পথশিশুর জীবনেও পৌঁছাবে; যেদিন তারা দর্শক নয়, অংশীদার হবে;সেদিনই এই মাসের রহমত পূর্ণতা পাবে। ততদিন পর্যন্ত আমাদের দায়িত্ব শেষ নয়।
লেখক,
আরিফুল ইসলাম রাফি
শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ-
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা।
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন
- • এআই খাতে একক আধিপত্যের বিরুদ্ধে শি, ২৯ দেশের জোট গঠন চীনের
- • গুম-ক্রসফায়ার ও অপতথ্যে শূন্য সহনশীলতা, সরকারের কঠোর বার্তা
- • এমআরটি-৫ প্রকল্পে ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমাল সরকার, অনুমোদনের অপেক্ষায় ডিপিপি
- • ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে স্পেন, এক নম্বর স্থান হারাল আর্জেন্টিনা
- • কুয়েতে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলার দাবি আইআরজিসির
- • কানাডার পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ ট্রাম্পের
- • মামলাজট কমাতে মামলা দায়েরের আগে বাধ্যতামূলক মধ্যস্থতা কার্যক্রম চালু
- • প্রশ্নপত্র ফাঁস নিয়ে উত্তাল ভারত, কড়া বার্তা দিলেন প্রধানমন্ত্রী মোদি
- • সরকার কোনো উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেবে না: প্রধানমন্ত্রী
- • কাতারের সাবেক আমিরের নামে ঢাকায় সড়কের নামকরণের সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর
- • ১০ হাজার পুলিশ নিয়োগের পরিকল্পনা করছে সরকার
- • আগামী ৫ দিন ভারী বর্ষণের আশঙ্কা: আবহাওয়া অধিদপ্তর
- • বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌদি আরবের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের বৈঠক
- • হঠাৎ কাতার সফরে গেলেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী
- • বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ৫০০ শিক্ষাবৃত্তি দেবে সৌদি আরব
- • কাতারে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের সর্ববৃহৎ ঘাঁটিতে ইরানের হামলা
- • চলমান যুদ্ধে প্রথমবারের মতো সিরিয়ায় হামলা চালাল ইরান
