১০ জুলাই ২০২৬, শুক্রবার, ০৩:১৩

শিরোনাম
‘মাদকে ভেজাল নেই, খাদ্যে ভেজাল!’ সংসদে ক্ষোভ সাবিকুন্নাহারের শেখ হাসিনাকে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে আসছেন প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী সিলেটে নতুন ডিসি আব্দুল্লাহ আল মামুন অনিয়মের অভিযোগে থামল ইন্টেরিমের ৬১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, একদিনে আক্রান্ত ৯৪৬ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সাথে ডাচ রাষ্ট্রদূতের বৈঠক
শিরোনাম
‘মাদকে ভেজাল নেই, খাদ্যে ভেজাল!’ সংসদে ক্ষোভ সাবিকুন্নাহারের শেখ হাসিনাকে ফেরাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে আসছেন প্রখ্যাত আলেম আল্লামা সাজ্জাদ নোমানী সিলেটে নতুন ডিসি আব্দুল্লাহ আল মামুন অনিয়মের অভিযোগে থামল ইন্টেরিমের ৬১ কোটি টাকার প্রকল্প প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ২ শিশুর মৃত্যু, একদিনে আক্রান্ত ৯৪৬ প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টার সাথে ডাচ রাষ্ট্রদূতের বৈঠক

পলিথিন নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাব ও এর প্রভাব

পলিথিন নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাব ও এর প্রভাব

কলাম লেখক

প্রকাশিত: ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১৬:২৫

পলিথিনের ব্যবহার আজকাল আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজার, দোকান, রেস্টুরেন্ট, গিফট শপ এবং হোলসেল মার্কেটে আমরা প্রতিদিন পলিথিন ব্যাগ, র‍্যাপ, স্ট্র এবং প্যাকেজিংয়ের মতো নানা ধরনের প্লাস্টিক ব্যবহার করি। এটি ব্যবহার সুবিধাজনক, সস্তা এবং বহনযোগ্য। কিন্তু এই সুবিধার সঙ্গে সঙ্গে এর পরিবেশগত এবং স্বাস্থ্যগত প্রভাব অনস্বীকার্য। দেশের বিভিন্ন আইন ও নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও, পলিথিন ব্যবহার কমাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না যা একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশে ২০০২ সালে প্রথমবারের মতো সরকার পলিথিন নিষিদ্ধের ঘোষণা দিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশকে রক্ষা করা, জলাধার, নদী ও শহরের নালা-নদীতে প্লাস্টিকের দূষণ কমানো। তবে বাস্তবতা হলো, ঘোষণার পরও বাজারে পলিথিনের ব্যবহার যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। যে কোনো দোকান বা বাজারে দেখা যায় পলিথিন ব্যবহার এখনও চরমভাবে চলছে। যদিও আইন আছে, কিন্তু প্রয়োগে শৃঙ্খলা নেই। এজন্য বলা যায়, পলিথিন নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অভাব দেশের পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি বড় ব্যর্থতা।

পলিথিনের পরিবেশগত প্রভাব ভয়াবহ। এটি সহজে দেহনির্গমন বা জৈবভাবে নষ্ট হয় না। নদী, খাল এবং নগর এলাকার জলাধারে পলিথিন জমে জলবাহিত জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নদীতে এই প্লাস্টিক জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত করছে, ফলে বান, বন্যা এবং জলাবদ্ধতার সমস্যা বাড়ছে। কেবল পরিবেশ নয়, মানুষ ও পশু-পাখির জন্যও এটি বিপজ্জনক। পশুপাখি পলিথিন গিলে ফেলে, যা তাদের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শহরের আবর্জনা ব্যবস্থাপনাও পলিথিনের কারণে জটিল হচ্ছে। সহজে জ্বালানোও সম্ভব নয়, পলিথিন জ্বলে ভয়াবহ ধোঁয়া সৃষ্টি করে যা শ্বাসপ্রশ্বাসে মারাত্মক প্রভাব ফেলে।

পলিথিন নিষিদ্ধের প্রয়াস থাকলেও বাস্তবায়নে স্পষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এর একটি বড় কারণ হলো সরকারি এবং স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারির অভাব। বাজার ও দোকানে নজরদারি করার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ পুলিশ বা পরিবেশ কর্মকর্তা নেই। যারা আইন প্রয়োগের দায়িত্বে থাকেন, তাদের মধ্যে অনেকেই দুর্বল প্রশাসনিক সক্ষমতার কারণে নিয়মকানুন কার্যকর করতে পারছেন না। এছাড়া সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতার অভাবও এক বড় কারণ। অনেক মানুষ জানে না যে পলিথিন ব্যবহারে পরিবেশের কত বড় ক্ষতি হচ্ছে, আবার অনেকেই সহজ সুবিধার কারণে সচেতনতা উপেক্ষা করে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি করে তারা ছোট থেকে প্লাস্টিক ব্যবহার কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে পারবে। টেলিভিশন, রেডিও ও সামাজিক মাধ্যমের মাধ্যমে পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব, বিকল্প উপকরণ এবং সচেতন ব্যবহার সম্পর্কে নিয়মিত প্রচারণা চালানো দরকার। এছাড়া ব্যবসায়ীদেরও দায়িত্ব নিতে হবে। দোকানদার ও বাজারে বিক্রেতাদের বিকল্প উপকরণ যেমন কাগজের ব্যাগ, জুট ব্যাগ বা পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ ব্যবহার করতে উৎসাহিত করতে হবে।

একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো বিকল্পের অভাব। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ কেবল পলিথিনের সহজলভ্যতা এবং সস্তার কারণে এটি ব্যবহার করে। কাগজের ব্যাগ বা পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগ অনেক সময় ব্যয়বহুল বলে মনে হয়। সরকারের উচিত এই বিকল্পগুলো সহজলভ্য, সাশ্রয়ী এবং আকর্ষণীয় করে তোলা। বাজারে কাগজ বা জুট ব্যাগের দাম কমিয়ে আনা, এবং পুনঃব্যবহারযোগ্য ব্যাগের প্রচার চালানো যেতে পারে।

শিল্পক্ষেত্রেও পলিথিনের ব্যবহার কমানোর উদ্যোগ জরুরি। খাদ্য ও শিল্প প্যাকেজিংয়ে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে biodegradable বা পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং তৈরির ওপর জোর দেওয়া উচিত। সরকারের মাধ্যমে শিল্প উদ্যোক্তাদের ট্যাক্স ছাড় বা প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে যাতে তারা পরিবেশবান্ধব প্যাকেজিং প্রযুক্তি ব্যবহার করতে উৎসাহিত হয়।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোরতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। অনেক সময় প্রশাসনিক কর্মকর্তা বা পুলিশকে দায়িত্ব দেওয়ার পরও তারা কোনো প্রকার জরিমানা বা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন না। ফলে ব্যবসায়ী বা সাধারণ মানুষকে কোনও ভয় কাজ করে না। এজন্য প্রয়োজন কড়াকড়ি আইন প্রণয়ন ও কঠোর প্রয়োগ। যারা নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যবহার করবেন, তাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও কঠোর জরিমানা আরোপ করতে হবে। এছাড়া এই নিয়মের নিয়মিত পর্যালোচনা ও নজরদারি জরুরি।

সচেতনতা, বিকল্প সরবরাহ এবং কঠোর আইন প্রয়োগ এই তিনটি উপাদান মিলেই পলিথিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। এগুলোর যে কোনওটি অবহেলা করলে, নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও পলিথিন ব্যবহার অব্যাহত থাকবে। আমাদের শহরগুলোকে স্বচ্ছ, স্বাস্থ্যসম্মত এবং ঝুঁকিমুক্ত রাখতে হলে এখনই পদক্ষেপ গ্রহণের প্রয়োজন।

সাধারণ জনগণও ভূমিকা রাখতে পারে। বাজার, দোকান, রেস্টুরেন্ট থেকে পলিথিন না নেওয়া এবং বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে স্বেচ্ছায় উদ্যোগ নেওয়া উচিত। পরিবার, স্কুল এবং কমিউনিটি পর্যায়ে ছোট থেকে সচেতনতা তৈরি করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পলিথিন ব্যবহার কমাতে সচেষ্ট হবে।

পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনেও এর প্রভাব আছে। শহরের নালায় জমে থাকা প্লাস্টিক জলে জীবাণু ও মশার প্রজনন বাড়াচ্ছে। এই মশা ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করছে। স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য এটি একটি মারাত্মক হুমকি। সুতরাং পলিথিন নিষিদ্ধ শুধু পরিবেশ রক্ষার নয়, মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও অত্যন্ত জরুরি।

অতএব, পলিথিন নিষিদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের, প্রশাসনের, ব্যবসায়ীদের এবং সাধারণ জনগণের যৌথ দায়িত্ব। সরকারকে কঠোর আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, প্রশাসনকে নজরদারি করতে হবে, ব্যবসায়ীদের বিকল্প ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে এবং জনগণকে সচেতন হতে হবে। এই একত্রিত প্রয়াস ছাড়া পলিথিনের ক্ষতিকর প্রভাব কমানো অসম্ভব।

পলিথিন নিষিদ্ধের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র একটি উপকরণ কমানো নয়; এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক দায়িত্বের প্রতীক। আমাদের শহর, গ্রাম, নদী ও পরিবেশকে নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যসম্মত রাখতে হলে এই বিষয়ে সক্রিয় পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। আমরা যদি এখনই না সচেতন হই, তবে ভবিষ্যতে আমাদের পরিবেশ, জীবনমান এবং স্বাস্থ্য হুমকির মুখে পড়বে।

লেখক,

আরশী আক্তার সানী
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
ইমেইল:[email protected]
 

আরও পড়ুন