ডিজিটাল বন্দি তরুণ: বিষন্নতার নতুন দুনিয়া
কলাম লেখক
প্রকাশিত: ০৫ মার্চ, ২০২৬, ০০:১১
বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শিক্ষার্থী সিফাত স্বপ্নবাজ ও অদম্য মেধাবী এক তরুণ। কিন্তু গত কয়েক মাসে সে যেন অন্য মানুষ হয়ে গিয়েছে। আগে বই হাতে নিয়ে নতুন নতুন কিছু শিখতে ভালোবাসত আর বন্ধুদের সঙ্গে বাইরে ঘুরত। এখন তার চোখের সামনে শুধু স্মার্টফোনের স্ক্রিন আর সোশ্যাল মিডিয়ার অজস্র পেজ। রাতভর ফোনে চোখ বুজে, সকালে উঠেই আবার স্ক্রিনের দিকে চেয়ে দিন কাটে তার। তার বন্ধুরা বলতে শুরু করেছে, “সিফাত, তুমি তো একদম চুপচাপ হয়ে গেছো, আগে যেমন ছিলে না।” কিন্তু সিফাত নিজেও বুঝতে পারছিল না কেন তার মন ভেঙে যাচ্ছে, কেন হৃদয় বিষণ্ণতায় ভরে উঠছে। সে আসলে ‘ডিজিটাল বন্দি’ হয়ে গিয়েছিল—অবসাদ আর একাকিত্বের সেই নতুন জগতে। গল্পটা সিফাতকে নিয়ে হলেও একই সমস্যায় ভোগছে বাংলাদেশের হাজার হাজার তরুণ। তারা প্রতিনিয়ত স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের জালে আটকে পড়ছে আর তার ফলশ্রুতিতে হারাচ্ছে মানসিক শান্তি ও সুখ।
বাংলাদেশ ইন্টারনেট রিসার্চ ফোরামের ২০২৪ সালের এক সূত্রমতে, বাংলাদেশের তরুণসমাজ গড়ে দিনে প্রায় ৫-৭ ঘণ্টা সময় স্ক্রিনে (মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাব) কাটায়। বাংলাদেশ মেন্টাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ২০২৫ এর জরিপ অনুযায়ী, ১৮-৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৪২% তরুণ বিষণ্ণতার লক্ষণ অনুভব করেন। এদের মধ্যে যাদের স্ক্রিন আসক্তির মাত্রা বেশি, তাদের মধ্যে বিষণ্ণতার মাত্রা ৬৫% বেশি পাওয়া গেছে। একসময় ফোন ছিল যোগাযোগের মাধ্যম আর এখন অনেক তরুণের জন্য ফোনই হয়ে উঠেছে নেশার মতো এক ঘেরাটোপ। দিনের বেশিরভাগ সময় স্ক্রিনে চোখ রেখে কাটানো নতুন প্রজন্মের মধ্যে বিষণ্ণতা, আত্মসম্মানহীনতা, ঘুমের ব্যাঘাত এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতা পর্যন্ত বাড়িয়ে তুলছে। গবেষণায় দেখা গেছে, দিনে পাঁচ-ছয় ঘণ্টার বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটানো তরুণদের মধ্যে বিষণ্ণতা ও উদ্বেগের হার দ্বিগুণ।অনলাইন জগতে অন্যের সফলতা, সৌন্দর্য আর সুখী জীবনের পোস্ট দেখে তারা নিজের জীবনকে তুচ্ছ ও ব্যর্থ মনে করে। এটিই তৈরি করে মানসিক বিষণ্ণতা ও আত্মবিশ্বাসহীনতা। অনেকেই এখন নিজেদের মূল্য নির্ধারণ করে 'ফলোয়ার ' বা ‘লাইক’-এর ওপর, যার ফলে সামান্য উপেক্ষা থেকেও হতাশা গেঁড়ে বসে তরুণদের মনে। এই আসক্তির আরও ভয়াবহ দিক হলো ঘুমের সমস্যা। রাতে অনেক তরুণ ভিডিও দেখে বা গেম খেলতে গিয়ে জেগে থাকে। ফলে ঘুমচক্র নষ্ট হয়ে যায় তাদের। সকালে ক্লান্তি, একাগ্রতার অভাব এবং শারীরিক দুর্বলতা দেখা দেয়। শুধু তাই নয়, বাস্তব জীবন থেকে ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে তারা। পরিবারের সঙ্গে কথাবার্তা কমে যাচ্ছে, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়ছে। আজকের তরুণরা হয়ে উঠছে 'অনলাইনে সক্রিয়, বাস্তবে নিঃসঙ্গ’ এক প্রজন্ম।
মনের মধ্যে প্রশ্ন জাগে তরুণ প্রজন্ম কেন নিজের অজান্তেই ডিজিটাল আসক্তির দিকে ধাবিত হচ্ছে। এর একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে প্রাকৃতিক সংস্পর্শ থেকে বিচ্ছিন্নতা। আগে তরুণরা বিকেলবেলা মাঠে খেলত, গাছে চড়ত, নদীর পাড়ে হাঁটতো, প্রকৃতির মাঝে সময় কাটাত। এখন শহর তো বটেই, গ্রামেও খেলার মাঠ, পার্ক বা খালি জায়গার সংকট। স্কুল শেষে হাঁটা দূরত্বে কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই। শরীর চলাচল ও প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ না থাকায় তরুণদের মন বিষণ্ণ হয়ে পড়ে, যা স্বাভাবিকভাবে অনলাইন আনন্দের মাঝে আশ্রয় খোঁজে। সোশ্যাল মিডিয়া, গেমিং, ইউটিউব এসবই হয়ে ওঠে তাদের ‘মস্তিষ্কের ডোপামিন ফিক্স’। এভাবেই শুরু হয় আসক্তি। তাছাড়া আজকের অভিভাবকরা নিজেরাও ব্যস্ত, কর্মজীবী, ক্লান্ত বা অনলাইন নির্ভর। অনেক তরুণ বেড়ে উঠছে এমন পরিবারে, যেখানে কথোপকথন কম, ভালোবাসার প্রকাশ কম। তাই আজকের তরুণসমাজ তাদের মানসিক চাহিদা, স্বীকৃতি, প্রশংসা, বন্ধুত্ব—এসব ডিজিটাল জগত থেকে খুজে নেয়। এরই ফাঁকে নিজেদের অজান্তে সোশ্যাল মিডিয়ার স্ক্রিন হয়ে যায় তাদের সঙ্গী। এছাড়া কয়েক বছর আগের করোনা মহামারীর প্রভাবও একটা বড় কারণ এক্ষেত্রে। ২০২০-২১ সালে দীর্ঘসময় স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। অনলাইন ক্লাস, ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব, স্ক্রিননির্ভর জীবন তরুণদের মধ্যে একটি স্বাভাবিক অভ্যাস গড়ে তুলেছে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসতে অনেকে আর চায় না বা পারেও না। এছাড়া সামাজিক স্বপ্নহীনতা ও হতাশাও আরেকটি বড় কারণ। বাংলাদেশের বহু তরুণ এখন কাজ, শিক্ষা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে। এই হতাশা থেকে পালানোর সহজ পথ হয়ে উঠছে মোবাইল স্ক্রিন। বাস্তব দুনিয়ার চাপ ভুলে সাময়িক শান্তি খোঁজে তারা ভার্চুয়াল জগতে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক মনোরোগ চিকিৎসক আহমেদ হেলাল বলেন, মোবাইলে ইন্টারনেট গেম আসক্তি অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্য ইয়াবা, হেরোইন, গাঁজা, মদ ইত্যাদি আসক্তির মতোই। পার্থক্য হচ্ছে- এটি আচরণগত আসক্তি, আর অন্যান্য নেশাজাত দ্রব্যের আসক্তি, রাসায়নিক আসক্তি। মস্তিষ্কের যে অংশে (রিওয়ার্ড সেন্টার) ইয়াবা বা গাঁজার মতো বস্তুর প্রতি আসক্তি জন্ম নেয়, ঠিক সেই অংশেই কিন্তু ইন্টারনেট বা গেমের প্রতি আসক্তি জন্মায়। তাই একে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। এটা থেকে সন্তানদের দূরে রাখতে পরিবারকে সতর্ক হতে হবে। মনোবিজ্ঞানী ড. ফারহানা আহমেদ বলেন, "ডিজিটাল আসক্তি ধীরে ধীরে ব্যক্তিকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে তোলে। এর থেকে মুক্তি পেতে সচেতনতা এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ জরুরি।" শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনের মতে, "শিশু-কিশোরদের মধ্যে এই আসক্তি বেশি দেখা যাচ্ছে। অভিভাবকদের উচিত সন্তানের ডিজিটাল ব্যবহার পর্যবেক্ষণ করা এবং বিকল্প শখ তৈরি করতে উৎসাহিত করা।"
তরুণদের ডিজিটাল আসক্তি থেকে মুক্ত করতে হলে এককভাবে নয়, বরং 'পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র' এই তিনটি স্তরের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পরিবারেই শুরু হয় মানবিক বিকাশের শিক্ষা। তাই বাবা-মায়েরা যদি সন্তানদের সঙ্গে আরও সময় কাটান, ভালোবাসার বন্ধন দৃঢ় করেন এবং নির্দিষ্ট স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম চালু করেন তবে তরুণরা ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তব জীবনে ফিরে আসতে পারে। পাশাপাশি সমাজেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা ও সামাজিক বন্ধন গড়ে তুলতে মহল্লা বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক উদ্যোগ নিতে হবে যাতে তরুণরা বিকল্প আনন্দ খুঁজে পায়। রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রয়োজন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন, স্কুল-কলেজে কাউন্সেলিং সেবা চালু এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা। একই সঙ্গে বাংলা ভাষায় মানসম্মত ও গঠনমূলক অনলাইন কনটেন্ট তৈরিতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বাড়ানো দরকার। পরিবার যদি ভালোবাসা দেয়, সমাজ যদি সাহচর্য দেয় এবং রাষ্ট্র যদি প্রয়োজনীয় নীতি ও সহায়তা দেয় তবে তরুণরা আবারও নিজের জীবন, সম্পর্ক ও ভবিষ্যতের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারবে।
লেখক,
মোহাম্মদ ইমতিয়াজ উদ্দিন
শিক্ষার্থী,
ফিন্যান্স বিভাগ,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
আরও পড়ুন
- • মুক্তির আগেই বিতর্কে শ্রদ্ধার ‘ঈথা’
- • অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে প্রথমার্ধে স্পেনের এক গোলের লীড
- • সৌদিতে অবৈধভাবে মাছ ধরায় ৬ বাংলাদেশি গ্রেপ্তার
- • সরকারি নিয়োগ কার্যক্রমে বাড়ছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্মানি
- • গবেষণা: দেরিতে চিকিৎসায় বাড়ছে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি
- • দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৭.৬৫ বিলিয়ন ডলার
- • আশুলিয়ায় শাশুড়ি হত্যা, আদালতে পুত্রবধূ
- • ৯ অঞ্চলে ঝড়-বৃষ্টির সতর্কতা, নদীবন্দরে সংকেত
- • ইরানকে আবারও নিশ্চিহ্ন করার হুমকি ট্রাম্পের
- • হরমুজ প্রণালিতে চলাচলকারী জাহাজকে ‘নির্ধারিত রুট’ অনুসরণের নির্দেশনা
- • সফর শেষে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন প্রধানমন্ত্রী
- • ৭০০ মিলিয়ন ডলারের জেট ইঞ্জিন বিক্রির পরিকল্পনা ট্রাম্প প্রশাসনের
- • যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে ইরানে মার্কিন হামলা, হরমুজে ফের অস্থিরতা
- • বাহরাইনের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিল ইরান
- • টস হেরে ব্যাটিংয়ে বাংলাদেশ, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট শুরু
- • ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পের পর আবার কাঁপল ভেনেজুয়েলা, নতুন কম্পনে বাড়ল আতঙ্ক
- • এবার শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল পাকিস্তান
- • ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরও ৬ জনের প্রাণহানি
