জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়: পুরান ঢাকার গলিতে জন্ম নেওয়া এক স্বপ্ন
লাবনী আক্তার শিমলা
প্রকাশিত: ১৯ এপ্রিল, ২০২৬, ০০:১৩
পুরান ঢাকার ঐতিহ্যে ঘেরা সঙ্কীর্ণ গলি পেরিয়ে, সদরঘাটের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে যে প্রতিষ্ঠান মাথা উঁচু করে, লাখো শিক্ষার্থীর আবেগ, স্বপ্ন ও সংগ্রামের সেই প্রতিষ্ঠানের নাম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মানচিত্রে জবি (জগান্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) নামটি এক অনন্য উচ্চতায় আসীন। এটি শুধুমাত্র একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, একটি জাতির ইতিহাসের সাক্ষী, হাজারো নিম্নবিত্ত পরিবারের আশার সুড়ঙ্গ। ১৬০ বছরের বেশি সময়ের বিবর্তনে শিক্ষার্থীদের ত্যাগ, তিতিক্ষা ও সাফল্যের গল্প প্রতিটি জবিয়ান ও বাংলার ইতিহাসের অমর ও অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সালটা ১৮৫৮, যখন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ব্রাহ্ম স্কুল হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ১৮৭২ সালে বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তার পিতা জগন্নাথ রায় চৌধুরীর স্মৃতি রক্ষার্থে একে জগন্নাথ কলেজে রূপান্তরিত করেন। অত্যন্ত স্বল্প সময়ের মধ্যে কলেজটি এতোটাই মানসম্মত হয়ে ওঠে যে, একে ‘পূর্ব বাংলার প্রেসিডেন্সি’ বলা হতো। তৎকালীন সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে যেসব কলেজ ছিল, তার মধ্যে জগন্নাথ কলেজের ফলাফল ও শিক্ষার মান ছিল প্রথম সারিতে।১৯২১ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, ঢাবি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষক, লাইব্রেরির বই এবং মেধা জোগাড় করার লক্ষ্যে জগন্নাথ কলেজের স্নাতক (ডিগ্রি) শাখা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এটিকে তখন একটি ইন্টারমিডিয়েট কলেজে রূপান্তর করা হয়। জগন্নাথের অনেক খ্যাতিমান শিক্ষক ও মেধাবী শিক্ষার্থীকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করা হয়। ইতিহাসে একে বলা হয় জগন্নাথের ‘মেধা বিসর্জন’।
তবে শিক্ষা অর্জনের যে তৃষ্ণা এই অঞ্চলের মানুষের ছিল, তা দমানো যায়নি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ১৯৪৯ সালে এখানে আবারও স্নাতক কোর্স এবং পরবর্তীতে স্নাতকোত্তর কোর্স চালু হয়, যা জগন্নাথের পুনর্জন্ম হিসেবে চিহ্নিত।
এরপর আসে ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাল, ১৯৫২। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে জগন্নাথ কলেজের ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ২১শে ফেব্রুয়ারি যখন ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তখন জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা দলে দলে সেই মিছিলে যোগ দেন। পুলিশের গুলিতে শহীদ হওয়া রফিক উদ্দিন আহমদ ছিলেন জগন্নাথ কলেজের ছাত্র। ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তার এই আত্মদান জগন্নাথকে চিরকালের জন্য আন্দোলনের সূতিকাগারে পরিণত করে।তাঁরই স্মৃতি ও সম্মানে জগন্নাথে শহীদ রফিক ভবন নামে একটি ভবন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে জগন্নাথ কলেজ ছিল আন্দোলনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আসাদ ও মতিউরের আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণায় জগন্নাথের শিক্ষার্থীরা ঢাকার রাজপথ দখল করে রেখেছিল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধেও এই প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অবিস্মরণীয়। ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি বাহিনী জগন্নাথ কলেজের ছাত্রাবাসে নির্মম গণহত্যা চালায়। অসংখ্য শিক্ষার্থী ও কর্মচারী সেদিন শহীদ হন। পুরো নয় মাস এই কলেজের অগণিত ছাত্র সম্মুখ সমরে অংশ নেন। তাই আজও জগন্নাথের প্রতি দেয়াল দেশপ্রেমের অঙ্কনে অঙ্কিত, দেশপ্রেমিকের ভালোবাসায় রঞ্জিত। তাই বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েও ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে ওঠা জবি ত্যাগের ফসলে পরিণত হয়েছে।
বর্তমান সময়ের ইতিহাসে এটি জবিয়ানদের জন্য এক গর্বের বিষয় যে, অত্যন্ত সীমিত অবকাঠামো নিয়ে শুরু করেও আজ এটি দেশের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি।গত এক দশকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সেশনজট নিরসন। এক সময় এখানে দীর্ঘ সেশনজটের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থমকে থাকত। বর্তমানে সেমিস্টার পদ্ধতির কঠোর অনুসরণ এবং শিক্ষকদের আন্তরিকতায় জবি এখন সেশনজটমুক্ত একটি প্রতিষ্ঠান। করোনা পরবর্তী সময়ে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রমেও জবি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।
বর্তমান সময়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেবল পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ইতিহাস বলছে, বিশ্বখ্যাত 'অ্যালপার ডগার (এডি) সায়েন্টিফিক ইনডেক্স' বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে জবির শিক্ষকদের নাম ওপরের দিকে থাকছে। ন্যানো টেকনোলজি, মলিকিউলার বায়োলজি এবং সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণায় জবি এখন আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব 'রিসার্চ জার্নাল'গুলোর মান এখন অনেক উন্নত।
জবির বর্তমান ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো এর আবাসন ব্যবস্থা। যদিও ২০২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দীর্ঘ প্রচেষ্টায় 'বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল' উদ্বোধন করা হয়েছে, যা ছাত্রীদের জন্য একটি স্বস্তির জায়গা তৈরি করেছে। কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠ বলছে অন্য কথা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ বছরের ইতিহাসে ছাত্রদের জন্য একটি স্থায়ী হলও তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এক সময়ের বেদখল হওয়া হলগুলো উদ্ধারে দীর্ঘ আন্দোলন চললেও, আইনি জটিলতা ও প্রশাসনের ধীরগতির কারণে ছাত্ররা এখনো আবাসন সুবিধা থেকে বঞ্চিত। পুরান ঢাকার সংকীর্ণ ও অস্বাস্থ্যকর মেসে থেকে হাজার হাজার ছাত্রকে তাদের শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করতে হয়, যা তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপের পাশাপাশি বিশাল আর্থিক বোঝা তৈরি করে।পুরান ঢাকার ঘিঞ্জি পরিবেশ, মশার উপদ্রব এবং নিরাপত্তার অভাব—এগুলো জবিয়ানদের নিত্যসঙ্গী। ছাত্রদের জন্য কোনো হল না থাকাটা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মৌলিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন হিসেবেই দেখা হয়।
মাত্র সাড়ে সাত একর জমিতে ২০ হাজার শিক্ষার্থীর চাপ অকল্পনীয়। ক্যান্টিন, কমনরুম, লাইব্রেরি কিংবা টিএসসিতে তিল ধারণের জায়গা থাকে না। একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের যে বিশাল চত্বর বা ছায়া সুনিবিড় পরিবেশ থাকার কথা, জবি সেখানে বড়ই নিঃস্ব। যদিও শিক্ষকরা ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় অনেক বড় বড় কাজ করছেন, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে গবেষণার বাজেট এখনো আন্তর্জাতিক মানের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক থেকে বের হলেই সদরঘাটের অসহনীয় জ্যাম এবং শব্দদূষণ শিক্ষার্থীদের একাগ্রতায় ব্যাঘাত ঘটাত। বর্তমানে মূল ফটকের সামনের বাস স্ট্যান্ড সরিয়ে ফেলা হয়েছে। যা যানজট অনেক কমিয়ে এনেছে, সেইসাথে শিক্ষার্থীদের বিচরণ আরামদায়ক করেছে।
এতসব সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে নিজেকে প্রমাণ করেছে, তা বিশ্বের অনেক নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছেও বিস্ময়।বর্তমানে বিসিএস (বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস) সহ ব্যাংক ও মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে জবিয়ানদের দাপট চোখে পড়ার মতো। গত কয়েকটি বিসিএসে ক্যাডার তালিকায় জবির অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারে জবির শিক্ষার্থীরা আজ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করছেন।
জবির থিয়েটার,তরুণ কলাম লেখক ফরাম, আইটি সোসাইটি, ডিবেটিং সোসাইটি এবং সংগীত বিভাগ জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে আসছে। এখানকার শিক্ষার্থীরা কেবল পড়াশোনায় নয়, বরং শিল্প-সংস্কৃতির চর্চায় এক অনন্য আদর্শ স্থাপন করেছে।ন্যানো প্রযুক্তি থেকে শুরু করে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে জবির বিজ্ঞান অনুষদের গবেষণাগুলো বিশ্বখ্যাত জার্নালে প্রকাশিত হচ্ছে। জবিয়ানরা প্রমাণ করেছেন, গবেষণার জন্য কেবল অট্টালিকা নয়, বরং মেধা ও ইচ্ছাশক্তিই প্রধান।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য আগামী দিনগুলো হবে এক বিশাল বিপ্লবের সময়। ঢাকার কেরানীগঞ্জে প্রায় ২০০ একর জমির ওপর নির্মিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস। এটি কেবল একটি ভবন নির্মাণ নয়, এটি একটি পূর্ণাঙ্গ আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় শহর হয়ে ওঠার স্বপ্ন।নতুন ক্যাম্পাসে প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য হলের সুব্যবস্থা থাকবে। মেসে থাকার কষ্ট আর থাকবে না, শিক্ষার্থীরা ফিরে পাবে তাদের কাঙ্ক্ষিত হল জীবন। সেখানে আধুনিক ল্যাবরেটরি, হাই-টেক পার্ক এবং স্বতন্ত্র গবেষণা ইনস্টিটিউট করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ফলে জবি থেকে আগামী দিনে বিশ্বমানের বিজ্ঞানী ও গবেষক বেরিয়ে আসবে।কেরানীগঞ্জের এই বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে তা স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আনবে এবং জবি হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সেরা উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বপ্নের নাম। এর প্রতিটি দেয়ালে রয়েছে প্রেম, মৈত্রী, হতাশা, আনন্দ, স্মৃতির অপরূপ সমস্ত কবিতা। কবিতার মতো নির্মল এর শিক্ষার্থীরা, আবার কবিতার মতই বিদ্রোহী। জ্ঞানের আলোর সান্নিধ্যে গড়ে উঠা এই অপরূপ প্রতীক জবিয়ানদের প্রাণ ও আত্মার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। দেশের অত্যন্ত তাৎপর্যময় এই প্রতিষ্ঠান আগামীতে দেশ ও জাতির শক্তি হয়ে উঠবে অচিরেই। তাই এই প্রাচীন ও তাৎপর্যময় প্রতিষ্ঠানের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ, আবাসন সংকটের দ্রুত সমাধান এবং গবেষণায় সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধির জন্য প্রশাসন ও সরকারের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাই।গর্বিত জবিয়ানরাই হয়ে উঠবে আগামীর সোপান।
লেখক,
লাবনী আক্তার শিমলা
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : [email protected]
আরও পড়ুন
- • তৃতীয় লিঙ্গের শিক্ষার্থীদের পাশে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
- • অস্ত্র সমর্পণের চাপ প্রত্যাখ্যান করল হামাস
- • সাহারা মরুভূমিতে ট্রাক বিকল, তৃষ্ণায় ৪৯ জনের মৃত্যু
- • গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ মির্জা ফখরুলের
- • ঢাকাসহ ১৯ জেলায় ঝড়বৃষ্টির শঙ্কা
- • হোমিওপ্যাথির প্রশংসায় ট্রলের শিকার আনুশকা শর্মা
- • ঢাকাসহ ১৪ জেলায় ঝড়ের পূর্বাভাস
- • গলাচিপায় বজ্রপাতে দুই কৃষকের মৃত্যু
- • ফ্রিল্যান্সারদের আয়ে থাকছে না সাড়ে সাত শতাংশ কর
- • ফ্লোরিডা নয়, ডোবার পাশেই মিলবে মশা দমনের শিক্ষা: প্রধানমন্ত্রী
- • রেলপথে নিরাপত্তাহীনতায় বাড়ছে ছিনতাই, প্রাণ সংশয়ে যাত্রীরা
- • বৈশ্বিক অস্থিরতায় স্বর্ণের দামে নতুন প্রভাব
- • জানা গেলো মৃত নুরজাহান বেগমের তিন ছেলে ও এক কন্যার পরিচয়
- • পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগ
- • ৫ দিনের বৃষ্টির খবর দিল আবহাওয়া অফিস
- • প্রশাসনে বড় রদবদল, সাত অতিরিক্ত সচিবকে নতুন দায়িত্ব
- • বুধবার বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার ঘোষণা করবে বিইআরসি
- • দেশের বাজারে আরও কমলো স্বর্ণের দাম
