০৪ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৫:২৭

শিরোনাম
নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ ডিসেম্বরে চালু হতে পারে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল : বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানি হয়েছে ৯৩ লাখের বেশি পশু ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরল ২৮১ প্রাণ :রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জুলাই থেকে চালু হচ্ছে হেলথ কার্ড, মিলবে স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরলেন ড. খলিলুর রহমান ৭ জুন থেকে মেট্রোরেলের শেষ ট্রেনে বাড়লো ২০ মিনিট
শিরোনাম
নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হলো অত্যাধুনিক ফ্লোটিং ক্রেন ‘বিএনএফসি বলীয়ান’ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধির সাক্ষাৎ ডিসেম্বরে চালু হতে পারে শাহজালালের থার্ড টার্মিনাল : বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ঈদুল আজহায় দেশে কোরবানি হয়েছে ৯৩ লাখের বেশি পশু ঈদযাত্রায় সড়কে ঝরল ২৮১ প্রাণ :রোড সেফটি ফাউন্ডেশন জুলাই থেকে চালু হচ্ছে হেলথ কার্ড, মিলবে স্বাস্থ্যসেবায় বিশেষ সুবিধা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়ে দেশে ফিরলেন ড. খলিলুর রহমান ৭ জুন থেকে মেট্রোরেলের শেষ ট্রেনে বাড়লো ২০ মিনিট

ঈদ ও ভোক্তাবাদী সংস্কৃতি

ঈদ ও ভোক্তাবাদী সংস্কৃতি

কলাম লেখক

প্রকাশিত: ১২ মার্চ, ২০২৬, ০১:১০

রমজান শুরু হতে না হতেই ঢাকার নিউমার্কেট, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্কে ভিড় জমতে শুরু করে। দোকানের সামনে রঙিন ব্যানার, ‘ঈদ অফার’, ‘স্পেশাল কালেকশন’- এমন নানা বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে। মনে হয় যেন ঈদ মানেই বড়সড় কেনাকাটার উৎসব। কিন্তু ঈদ মানে তো শুধুই কেনাকাটার উৎসব নয়, এর পেছনে আরো বড় অর্থবহ কারণ আছে।ঈদুল ফিতর মূলত আত্মসংযম, সহমর্মিতা আর কৃতজ্ঞতার উৎসব। এক মাস রোজা রাখার পর ঈদের দিন নতুন জামা পরে যখন মানুষ নামাজে যায়, সেটা শুধু বাইরের আনন্দ না - ভেতরে একটা আধ্যাত্মিক শান্তিও থাকে। কিন্তু দিন বদলেছে, ঈদের রূপটাও বদলে যাচ্ছে। এখন ঈদের আগে শহরগুলোতে যে কেনাকাটার ঢল নামে, সেটা দেখলে মনে হয় উৎসবটা কখন যেন ভোক্তাবাদী সংস্কৃতির উৎসবে পরিণত হয়ে গেছে।

ভোক্তাবাদী সংস্কৃতি বলতে বোঝায় এমন একটি সামাজিক প্রবণতা, যেখানে মানুষের আনন্দ, মর্যাদা এমনকি সমাজে তার পরিচয়টুকুও অনেকটা নির্ধারিত হয় সে কী কিনছে, কতটা কিনছে তার উপর ভিত্তি করে। কে কোন ব্র্যান্ডের জামা পরল, কোন রেস্তোরাঁয় খাবার খেলো, কার বাড়ির সাজসজ্জা বেশি সুন্দর - এই তুলনার খেলায় মানুষ অজান্তেই ঢুকে পড়ে। এই "দেখানোর সংস্কৃতি" একটা অদৃশ্য চাপ তৈরি করে মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে। এভাবে ঈদের আনন্দ ধীরে ধীরে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় রূপ নিচ্ছে।

বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে এই প্রবণতা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। ঈদের কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই বিভিন্ন শপিংমল, ফ্যাশন হাউস এবং ব্র্যান্ডের দোকানে মানুষের ভিড় বেড়ে যায়।রমজানের আগে থেকেই "ঈদ কালেকশন" বাজারে ছাড়ে। বিজ্ঞাপনগুলো এমনভাবে বানানো যে মনে হয়, ওই বিশেষ পাঞ্জাবিটা বা ওই শাড়িটা না কিনলে ঈদটাই বুঝি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মানুষও সেই ফাঁদে পা দেয় - সচেতনে না হলেও অবচেতনে। অনেক পরিবারই চেষ্টা করে অন্তত একাধিক নতুন পোশাক কিনতে। শিশুদের জন্য আলাদা, বড়দের জন্য আলাদা, আবার অনেক সময় ঈদের দিন, ঈদের পরের দিন- প্রতিটি দিনের জন্য আলাদা পোশাকও কেনা হয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। ঈদের দিন কে কী পরেছে, কোথায় ঘুরতে গেছে, কী ধরনের খাবার খাচ্ছে- এসব ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাগাভাগি করা এখন খুবই সাধারণ ব্যাপার। ফলে অনেক সময় অজান্তেই এক ধরনের সামাজিক প্রতিযোগিতা তৈরি হয়। মানুষ ভাবতে শুরু করে- অন্যদের মতো আমাকেও হয়তো আরও ভালো কিছু কিনতে হবে, আরও সুন্দরভাবে উদযাপন করতে হবে।

শুধু শহরেই নয়, এই প্রভাব এখন গ্রামাঞ্চলেও পৌঁছে গেছে। আগে গ্রামে ঈদ মানেই ছিল খুব সহজ-সরল আনন্দ- নতুন পোশাক, মসজিদে নামাজ, আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়া, আর শিশুদের খেলাধুলা। এখন টেলিভিশন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে গ্রামের তরুণ-তরুণীরাও শহরের ফ্যাশন ও ব্র্যান্ডের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে গ্রামেও ধীরে ধীরে ভোক্তাবাদী সংস্কৃতির প্রভাব বাড়ছে। এই ভোক্তাবাদী প্রবণতার আরেকটি দিকও রয়েছে, যা আমাদের ভাবিয়ে তোলে। বাংলাদেশের সমাজে এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা ঈদের সময় নতুন পোশাক কেনার সামর্থ্যও রাখেন না। দিনমজুর, রিকশাচালক, গার্মেন্টস শ্রমিক কিংবা পথশিশুদের জীবনে ঈদের আনন্দ অনেক সময় খুব সীমিত।যখন সমাজের এক অংশ বড় বড় শপিংমলে কেনাকাটায় ব্যস্ত থাকে, তখন অন্য অংশের মানুষ হয়তো চিন্তা করে- এই ঈদে পরিবারের জন্য নতুন পোশাক কিনতে পারবে কি না। ফলে ঈদের আনন্দ সবার জীবনে সমানভাবে পৌঁছায় না। এই বৈষম্য আমাদের সমাজের একটি বাস্তব চিত্র।

ভোক্তাবাদকে এককথায় খারাপ বলা যায় না।কেনাকাটা আনন্দের, নতুন জামা পরা আনন্দের। সমস্যা হয় যখন কেনাকাটাটাই মূল উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, আর ঈদের আসল মর্মটা পেছনে পড়ে যায়। ঈদুল ফিতর তো আসলে একটা কৃতজ্ঞতার দিন - এক মাসের সংযমের পর আনন্দ উদযাপনের দিন। যাকাত, ফিতরা, গরিব প্রতিবেশীকে মনে রাখার দিন। কিন্তু এখন অনেক পরিবারে ফিতরার হিসাবের চেয়ে শপিং বাজেটের হিসাব বেশি হয়। কতটুকু দান করবে সেটা নিয়ে ভাবার সময় পায় না। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই বৈষম্যটা আরও চোখে পড়ে। ঢাকার শপিং মলে যখন কোটি টাকার বেচাকেনা হচ্ছে, তখন গার্মেন্টস শ্রমিকরা ঠিকমতো বেতন পেয়ে বাড়ি যেতে পারবেন কিনা সেই দুশ্চিন্তায় থাকেন। যাদের হাতের তৈরি জামা আমরা ঈদে পরি, তাদের অনেকের নিজের ঈদটাই কাটে অনিশ্চয়তায়। তবে এটাও অস্বীকার করা যায় না যে ঈদকে ঘিরে বাজারে যে কেনাকাটা বাড়ে, তা দেশের অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের সময় ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়, ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে বড় ব্যবসায়ী- অনেকেই লাভের মুখ দেখে। পোশাক শিল্প, পরিবহন খাত, খাদ্য ব্যবসা- সবখানেই অর্থনৈতিক কার্যক্রম বেড়ে যায়। অনেক অস্থায়ী কর্মসংস্থানও তৈরি হয়। ফলে ঈদের বাজার পুরোপুরি নেতিবাচক নয়, এটি অর্থনৈতিক গতিশীলতারও একটি অংশ।

সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কেনাকাটা আনন্দের স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে সামাজিক মর্যাদার প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়। তখন ঈদের মূল শিক্ষা- সংযম ও সহমর্মিতা- ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। এই পরিবর্তনের মাঝেও আমাদের মনে রাখা দরকার যে ঈদের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে মানুষের সম্পর্কের মধ্যে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ নেওয়া, প্রতিবেশীর সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা— এসবের মধ্যেই ঈদের প্রকৃত আনন্দ। বিশেষ করে দরিদ্র মানুষের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টি ঈদের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। ইসলাম ধর্মে যাকাত ও ফিতরার মাধ্যমে সমাজের অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথা বলা হয়েছে। যদি আমরা নিজেদের আনন্দের পাশাপাশি অন্যদের কথাও একটু ভাবি, তাহলে ঈদের আনন্দ আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।তাই আমাদের উচিত - ভোক্তাবাদকে পুরোপুরি ধারণ না করে, ঈদকে আসল অর্থে উদযাপন করার।কেনাকাটা থাকবে, নতুন পোশাকও থাকবে- কিন্তু সেটিই যেন ঈদের একমাত্র পরিচয় না হয়ে ওঠে।

লেখক,
তামান্না ইসলাম
শিক্ষার্থী, শিক্ষা ও গবেষণা ইন্সটিটিউট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
ইমেইল : [email protected] 

আরও পড়ুন