কুসংস্কারে ঘেরা মানসিকতা, ডাক্তারের পরিবর্তে পীরের সাক্ষাৎ
লাবনী আক্তার কবিতা
প্রকাশিত: ২৭ মার্চ, ২০২৬, ১৪:৪১
দেশ এখন একবিংশ শতাব্দীতে পৌছে গেছে। সবার হাতেই রয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি। সবাই এখন উন্নত। কিন্তু আসলেই কী তাই? বিশ্বে যখন আধুনিকতা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তখন কেমন আছে বাংলাদেশের মানুষ। সবাই কী প্রযুক্তির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পেরেছে। নাকি এখনো কেউ কেউ পড়ে আছে সেই আদিযুগে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যানের তথ্যমতে এখনো বাংলাদেশের শহরে ৪২% এবং গ্রামে ৫৮%মানুষ বসবাস করে। শহরের মানুষগুলো নিঃসন্দেহে বিচার উন্নত। তাদের হাতের মুঠোয় রয়েছে প্রযুক্তি এবং প্রযুক্তির সকল সেবা। এক্ষেত্রে গ্রামের চিত্রটা একটু ভিন্ন। যদিও বর্তমানে গ্রামে মোবাইল নেটওয়ার্ক এখন প্রায় সর্বত্র পৌঁছে গেছে। কিন্তু শহরের তুলনায় ইন্টারনেট স্পিড ও মান কম, বিশেষ করে 4G কাভারেজে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। চিকিৎসা ক্ষেত্রে প্রতিটি ইউনিয়নে প্রায় ১টি করে কমিউনিটি ক্লিনিক আছে কিন্তু ডাক্তার ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব অনেক সময় ক্লিনিকে চিকিৎসক না থাকায় শুধু ওষুধ বিতরণ হয়। জরুরি চিকিৎসা ও বিশেষায়িত সেবা (যেমন ক্যানসার, হার্ট, অস্ত্রোপচার) পেতে শহরে যেতে হয়। চিকিৎসা অবকাঠামো (এম্বুলেন্স, মেডিকেল যন্ত্রপাতি, মানসম্মত ওষুধ) শহরের তুলনায় পিছিয়ে। গ্রামের সকলের কাছে ইন্টারনেট পৌঁছে থাকলেও উন্নত হয়নি শিক্ষার মান ফলে উন্নত হয়নি তাদের মানসিকতা। তাইতো এখনো কোন রোগ দেখা দিলে গ্রামের মানুষের মধ্যে হাসপাতাল বা কমিউনিটি ক্লিনিকে যাওয়ার থেকে পীর বা কোন কবিরাজের দরবারে যাওয়াই শ্রেয় মনে হয়। রোগ হলে প্রথমে কবিরাজ, ওঝা বা ঝাড়ফুঁকের কাছে যাওয়া। টিকা সম্পর্কে ভয় (বিশেষত শিশুদের টিকায় অন্ধবিশ্বাস যে এটি ক্ষতিকর হতে পারে) থেকে টিকা গ্রহণ না করা। অনেক গ্রামীণ পরিবার এখনও বিশ্বাস করে, “বাড়িতেই সন্তান জন্ম দেওয়া উত্তম”, যার ফলে মাতৃমৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ে। গ্রামে মানুষ এখনো চিকিৎসার ক্ষেত্রে পীর, কবিরাজ, আধ্যাত্মিক ব্যক্তিদের দিকে প্রথমে আশ্রয় নেন। অনেক গ্রামীণ মহিলা ও বয়স্ক মানুষ চিকিৎসার জন্য তাবিজ, পানি-পরা, হুজুর বা কবিরাজদের উপর নির্ভর করেন।
চট্টগ্রামের ভবানিপুর ও জোবরা গ্রামে এক গবেষণায় দেখা গেছে—অসুস্থ হলে অনেক মানুষ প্রথমে পীর, কালামি, ভান্ডারি, কবিরাজ ও আধ্যাত্মিক চিকিৎসকদের কাছে যায়। চিকিৎসা ব্যর্থ হলে শহরে গিয়ে চিকিৎসকের কাছে যায়, তারাও ব্যর্থ হলে আবার ঐ পীরদের কাছে ফিরে যায়। গ্রামীণ মানুষদের এ সকল পীরদের প্রতি অন্ধ বিশ্বাসের পিছনে কিছু সাংস্কৃতিক ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক কারণ রয়েছে।
এদেশে ইসলাম ছড়িয়ে পড়েছিল মূলত সুফি সাধক ও পীরদের মাধ্যমে। ফলে গ্রামীণ মানুষ তাদেরকে শুধু ধর্মীয় নেতা নয়, বরং বিশ্বাসযোগ্য আত্মিক অভিভাবক মনে করে।ফলে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পীররা গ্রামে মাজার, খানকা ও আশ্রম গড়ে তুলেছেন। তারা মনে করে পীরের দোয়া বা আশীর্বাদে রোগ সারতে পারে, সন্তান হতে পারে, দুঃখ দূর হতে পারে। গ্রামের সাধারণ মানুষ জিন-ভূত, অদৃশ্য শক্তি বা ভাগ্যের ওপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে—তাদের কাছে পীরই এসব সমস্যার সমাধানকারী। গ্রামের মানুষের উপর ভরসা করার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে - গ্রামে ডাক্তার বা হাসপাতাল পাওয়া কঠিন, কিন্তু পীর বা কবিরাজ সহজেই মেলে। ফলে তাদের কাছে চিকিৎসার চেয়ে পীর সহজলভ্য। এছাড়াও চিকিৎসা বা শহরে যাওয়া ব্যয়বহুল; কিন্তু পীরকে কিছু টাকা, খাবার, কিংবা মানত দিলেই চলে। কী হতে পারে এর পরিনতি? চিকিৎসা বিজ্ঞান এখন অনেক উন্নত। কোন রোগ হলে তার জন্য প্রয়োজন সঠিক চিকিৎসা। কিন্তু এই পীরদের কাছে যাওয়ার ফলে বছর পর বছর ধরে সাধারণ মানুষের রোগ তো নিরাময় হয় না বরং দেখা দেয় আরো বড় সমস্যা।
২০০৫ সালে প্রকাশিত The Daily Star-এ একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, হাড়-ভঙ্গের চিকিৎসার নামে গ্রামে অনৈতিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা করায় অনেক শিশুর হাত পা গ্যাংগ্রিনে আক্রান্ত হয়ে কাটা প্রয়োজন হয়। যেমন: লালমনিরহাটে এক Class One-শিক্ষার্থীর হাত কাটা হয়েছিল ভুল চিকিৎসার কারণে। অনেক মানসিক রোগকে জিন-আতঙ্ক বা আত্মা-আত্মা প্রবেশ হিসাবে দেখা হয়, ফলে রোগীর পরিবার পীর এর কাছে নিয়ে যায়। ফলে চিকিৎসার প্রচলিত পথ অনুসরণ না করলে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হয়। এক নারী পীরের কাছে যেতে গিয়ে মানসিকভাবে সেরা অবস্থা থেকে ডিপ্রেশনে চলে গিয়েছিলে কিন্তু ডাক্তারের কাছে গেলে দ্রুতই সুস্থ হয়েছেন। খবরের পাতা বা আমাদের গ্রাম গুলো পরিদর্শন করলে পীরদের এরকম হাজারো কীর্তিকলাপ সামনে আসবে। তাই সময় এখন সচেতনতার। গ্রামীণ মস্তিষ্কে বসা জেঁকে বসা এই পীরদের অন্ধভক্তি ও চিকিৎসার প্রতি অনীহা কমাতে প্রয়োজন কিছু পদক্ষেপ। গ্রাম পর্যায়ে ক্যাম্পেইন: স্কুল, মসজিদ, হাট-বাজারে নিয়মিত স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম।
বাস্তব উদাহরণ (যেমন ভুল চিকিৎসায় হাত-পা কাটা বা মৃত্যু) তুলে ধরে প্রচার করা।
গ্রামে চিকিৎসকের উপস্থিতি বাড়ানো: ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে MBBS ডাক্তার পোস্টিং নিশ্চিত করা।কমিউনিটি ক্লিনিক শক্তিশালীকরণ: ওষুধ, ডাক্তার, ল্যাব সেবা নিয়মিত রাখা।
ভুয়া ডাক্তার/কবিরাজ/ওঝা দমন: যারা চিকিৎসার নামে প্রতারণা করছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা।তাবিজ/ঝাড়ফুঁক নির্ভর চিকিৎসার বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা।
পরিশেষে বলা যায় যে, আধুনিক এই যুগে দেশকে উন্নত করতে সকলের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তাই গ্রামীন মানুষদের কে পিছনে ফেলে দেশ উন্নত হবে এটি কখনোই কাম্য। সরকার ও দেশবাসীর উচিত গ্রামীণ মানুষদের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া। এবং তারা যেন প্রযুক্তিগত ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে সকল সুবিধা পায় তা নিশ্চিত করা।
লেখক,
লাবনী আক্তার কবিতা
লোক প্রশাসন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়,ঢাকা
ইমেইল: [email protected]
আরও পড়ুন
- • ইরান এখন বিশ্বের কাছে শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি-পেজেশকিয়ান
- • ট্রাম্পের শান্তি চুক্তিতে যুদ্ধ থামলেও কাটেনি মার্কিনদের উদ্বেগ
- • রোববার শুরু ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন
- • টাইমস ইমপ্যাক্ট র্যাংকিং ২০২৬: বড় সাফল্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
- • আবারও কমল স্বর্ণের দাম, ভরিতে কমেছে ২,২১৬ টাকা
- • চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • প্রথমবার নকআউটে কানাডা
- • ভেনেজুয়েলার পর জাপানে ৬.৯ মাত্রার ভূমিকম্প
- • চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড
- • ডেভিডের হ্যাটট্রিকে কাতারকে উড়িয়ে দিল কানাডা
- • কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ
- • বন্ধ কারখানাগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • মালয়েশিয়ার ২ হাজার বন্দিদের ফেরানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
- • বগুড়ার সেই দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর
- • বগুড়ার ৩ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- • মালয়েশিয়ার পথে রওনা হলেন প্রধানমন্ত্রী
- • ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিল ইরান
- • যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বৈঠকে সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
