বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের ভূমিকা
হেনা শিকদার
প্রকাশিত: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০১:৫৯
জাতিসংঘ (United Nations)। ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যখন এই সংস্থাটি যাত্রা শুরু করেছিল, তখন মানুষের চোখে ছিল আগামীর এক শান্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন। প্রতিশ্রুতি ছিল—'যুদ্ধ নয়, শান্তি'। কিন্তু আজ ৮১ বছর পর (২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে), বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট যখন ইউক্রেন থেকে গাজা, কিংবা সুদান থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত উত্তপ্ত, তখন সঙ্গত কারণেই আমাদের মনে প্রশ্ন উঠে: জাতিসংঘ কি আজও কার্যকর, নাকি এটি কেবল একটি ব্যয়বহুল 'টক শপে' পরিণত হয়েছে?
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের লেলিহান শিখা যখন স্তিমিত হয়ে এল, তখন ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে এক শান্তিময় পৃথিবীর স্বপ্ন বুনেছিলেন তৎকালীন বিশ্বনেতারা। সান ফ্রান্সিসকো সম্মেলনের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছিল 'জাতিসংঘ'। মূলমন্ত্র ছিল—আগত প্রজন্মকে যুদ্ধের অভিশাপ থেকে রক্ষা করা। কিন্তু আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে যখন আমরা পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন সেই স্বপ্ন আর বাস্তবতার মধ্যে এক বিশাল ব্যবধান চোখে পড়ে। ইউক্রেন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য, কিংবা আফ্রিকার গৃহযুদ্ধ—প্রতিটি সংকটে যখন লাশের মিছিল দীর্ঘ হয়, তখন সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, জাতিসংঘ কি কেবল একটি নামসর্বস্ব সংস্থায় পরিণত হয়েছে? নাকি আজও পর্দার আড়ালে এটিই মানবতার শেষ আশ্রয়স্থল?
জাতিসংঘের অকার্যকর হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণটি বিশেষজ্ঞরা বারবার তুলে ধরেন, তা হলো এর নিরাপত্তা পরিষদের একপাক্ষিক ক্ষমতা কাঠামো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে গঠিত এই কাঠামোয় পাঁচটি স্থায়ী সদস্য দেশকে যে 'ভেটো' ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল, তা আজকের পরিবর্তিত বিশ্বে অনেকটা গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখনই কোনো পরাশক্তির স্বার্থে আঘাত লাগে, তখনই তারা ভেটো প্রয়োগ করে বিশ্বশান্তির পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফিলিস্তিন ইস্যুতে আমেরিকা কিংবা ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার অবস্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, জাতিসংঘ আসলে তার সদস্য রাষ্ট্রগুলোর—বিশেষ করে শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর—ইচ্ছার বাইরে এক পা-ও নড়তে পারে না। এই যে ক্ষমতার দাবার ঘুঁটি চাল, এর ফলে সাধারণ মানুষের কাছে জাতিসংঘ আজ এক 'ঠুঁটো জগন্নাথ' হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
তবে কেবল ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে জাতিসংঘকে বাতিল করে দেওয়াটা হবে একপাক্ষিক বিচার। জাতিসংঘ মানে তো কেবল নিরাপত্তা পরিষদ নয়। এর বাইরেও রয়েছে ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির মতো সংস্থাগুলো। যুদ্ধের ময়দানে যখন কামান গর্জে ওঠে, তখন হয়তো জাতিসংঘ ব্যর্থ হয়; কিন্তু সেই যুদ্ধের ফলে সৃষ্টি হওয়া দুর্ভিক্ষ বা মহামারির বিরুদ্ধে লড়তে জাতিসংঘই সবার আগে এগিয়ে আসে। গত কয়েক দশকে পোলিও নির্মূল থেকে শুরু করে চরম দারিদ্র্য বিমোচন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিশ্বকে এক করা—এই কাজগুলো জাতিসংঘ ছাড়া অসম্ভব ছিল। আমরা হয়তো বড় কোনো যুদ্ধের সময় তাদের অসহায়ত্ব দেখি, কিন্তু প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ শিশুর মুখে খাবার তুলে দেওয়া বা শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার নীরব কাজগুলো আমাদের নজরে আসে না। এটাই জাতিসংঘের সবচেয়ে বড় সার্থকতা—সেটি হলো তার মানবিক আবেদন।
বর্তমান পৃথিবী ১৯৪৫ সালের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। এখন আর কেবল ট্যাংক বা মিসাইল দিয়ে যুদ্ধ হয় না; এখন যুদ্ধ হয় সাইবার স্পেসে, এখন যুদ্ধ হয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে। বিশ্বশান্তি রক্ষায় জাতিসংঘের সামনে এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই আধুনিক প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট শরণার্থী সমস্যা এবং ক্রমবর্ধমান উগ্র জাতীয়তাবাদ সংস্থাটির ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। পরাশক্তিগুলোর মধ্যে শুরু হওয়া নতুন এক 'শীতল যুদ্ধ' জাতিসংঘকে কার্যত এক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় ঠেলে দিয়েছে। বিশ্ব যদি আজ দুই বা ততোধিক মেরুতে ভাগ হয়ে যায়, তবে কোনো একটি একক সংস্থার পক্ষে শান্তি বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
জাতিসংঘ নিখুঁত কোনো সংস্থা নয়, বরং এটি পৃথিবীর রাষ্ট্রগুলোর একটি সম্মিলিত প্রতিচ্ছবি মাত্র। বিশ্বনেতারা যতটা দায়িত্বশীল হবেন, জাতিসংঘও ঠিক ততটাই কার্যকর হবে। বর্তমান জরাজীর্ণ ভবনটিকে যেমন সংস্কারের প্রয়োজন হয়, তেমনি ৮১ বছরের পুরনো এই সংস্থাকেও আজকের পৃথিবীর উপযোগী করে গড়ে তোলা দরকার। নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, ভেটো ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা ছাড়া এর কোনো বিকল্প নেই। জাতিসংঘ হয়তো আমাদের 'স্বর্গ' দিতে পারেনি, কিন্তু এটি না থাকলে পৃথিবী অনেক আগেই 'নরক' হয়ে যেত। তাই একে অকার্যকর বলে ছুড়ে না ফেলে, বরং সময়ের প্রয়োজনে মেরামত করে শক্তিশালী করাই হবে মানবজাতির টিকে থাকার একমাত্র পথ।
লেখক,
হেনা শিকদার
শিক্ষার্থী,দর্শন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যাল,ঢাকা
আরও পড়ুন
- • হজ শেষে দেশে ফিরেছেন ৬৪ হাজারের বেশি হাজি, মৃত্যু ৫৪ জনের
- • ঢাকা-তেহরান সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রস্তাব ইরানের
- • সাপাহার সীমান্তে ৭ জনকে পুশইনের চেষ্টা, প্রতিহত করল বিজিবি
- • বিধ্বংসী ভূমিকম্পে ভেনেজুয়েলার পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা ব্রাজিল-আর্জেন্টিনার
- • আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের দরপতন অব্যাহত
- • মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন হচ্ছে, গঠন হবে পৃথক ট্রাইব্যুনাল :স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
- • ইরান এখন বিশ্বের কাছে শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি-পেজেশকিয়ান
- • ট্রাম্পের শান্তি চুক্তিতে যুদ্ধ থামলেও কাটেনি মার্কিনদের উদ্বেগ
- • চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডলিংয়ে সর্বোচ্চ রেকর্ড
- • ডেভিডের হ্যাটট্রিকে কাতারকে উড়িয়ে দিল কানাডা
- • কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে প্রধানমন্ত্রীর শোক প্রকাশ
- • বন্ধ কারখানাগুলোয় বিদেশি বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
- • মালয়েশিয়ার ২ হাজার বন্দিদের ফেরানোর আশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর
- • বগুড়ার সেই দুই ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর
- • বগুড়ার ৩ ইউনিয়নের নাম পরিবর্তনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর
- • মালয়েশিয়ার পথে রওনা হলেন প্রধানমন্ত্রী
- • ফের হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দিল ইরান
- • যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের বৈঠকে সুইজারল্যান্ডে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান
