২৫ জুন ২০২৬, বৃহস্পতিবার, ১৪:০২

শিরোনাম
ঢাকা-তেহরান সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রস্তাব ইরানের রোববার শুরু ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর 'বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১' থেকে ৫ বছরে নিট মুনাফা ১৬৪ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিভাগের ঘোষণা, ৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকবে সরবরাহ জুলাইতেই মিলতে পারে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের সুখবর দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে শুরু প্রস্তুতি পেনশনের ভোগান্তি কমাতে ওপিটিএমএস চালু করছে সরকার
শিরোনাম
ঢাকা-তেহরান সরাসরি ফ্লাইট চালুর প্রস্তাব ইরানের রোববার শুরু ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর 'বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১' থেকে ৫ বছরে নিট মুনাফা ১৬৪ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিভাগের ঘোষণা, ৯ ঘণ্টা বন্ধ থাকবে সরবরাহ জুলাইতেই মিলতে পারে মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের সুখবর দ্বিতীয় পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে শুরু প্রস্তুতি পেনশনের ভোগান্তি কমাতে ওপিটিএমএস চালু করছে সরকার

সমুদ্র উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

সমুদ্র উপকূলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

লাবনী আক্তার শিমলা

প্রকাশিত: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০০:৩০

ভৌগোলিকভাবে বৈপরীত্যের এক অনন্য উদাহরণ হলো বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল। সমুদ্রের তীরে গড়ে ওঠা এই উপকূলীয় অঞ্চল একদিকে যেমন অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, অন্যদিকে এটি কৃষি উৎপাদন ও মৎস্য সম্পদের এক অপার সম্ভাবনা। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবেও এই উপকূলীয় অঞ্চল আজ চিহ্নিত। জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (IPCC)-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে।

বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মেরু অঞ্চলের বরফ গলে যাচ্ছে, তাপীয় সম্প্রসারণের কারণে বাড়ছে সমুদ্রের পানির আয়তন। IPCC-র ষষ্ঠ মূল্যায়ন প্রতিবেদন (AR6) অনুযায়ী, ১৯০১ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা গড়ে ০.২০ মিটার বেড়েছে এবং এই বাড়ার হার ক্রমাগত বাড়ছে। বর্তমানে এই হার প্রতি বছর প্রায় ৩.৭ মিলিমিটার। এই পরিস্থিতির প্রভাব অন্যান্য স্থানের তুলনায় বাংলাদেশের ওপর বেশি পড়বে। কারণ বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে অবস্থিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ এবং বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (BWDB) যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির গড় বার্ষিক হার ৪.৫৮ মিলিমিটার, যা বৈশ্বিক গড়ের চেয়ে প্রায় ২৪ শতাংশ বেশি। সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় পূর্ব উপকূলে, বিশেষত চট্টগ্রাম অঞ্চলে। সেখানে এই হার ৫.২ মিলিমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপকূলীয় অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। এর কারণ মূলত তিনটি। প্রথম কারণ,  ভূ-আন্দোলন ও ভূমিধস। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল টেকটোনিকভাবে সক্রিয় একটি এলাকা। পূর্বাঞ্চল ত্রিপুরা-চট্টগ্রাম ভাঁজ অঞ্চলের অংশ, যা এখনও ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছে, আবার কিছু কিছু এলাকায় ভূমিধসও হচ্ছে। বর্তমানে কিছু এলাকায় ভূমি সংকোচনের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা সরাসরি ভূমিধসের সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে। দ্বিতীয় কারণ, বদ্বীপের প্রাকৃতিক ধস। বঙ্গোপসাগরের তলদেশে পলি জমার পরিমাণ এবং ভূত্বকের নমনীয়তার কারণে গাঙ্গেয় বদ্বীপের কিছু অংশ স্বাভাবিকভাবেই ধসে যাচ্ছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD)-এর গবেষণা বলছে, এই প্রাকৃতিক ধসের হার প্রতি বছর ১.৫ থেকে ২ মিলিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। তৃতীয় কারণ , নদী অববাহিকায় পানি প্রবাহ হ্রাস পাওয়া। পদ্মা-মেঘনা-যমুনার উজানে বাঁধ ও ব্যারাজ নির্মাণের ফলে নদীবাহিত পললের পরিমাণ কমে যাচ্ছে। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বন্যার সময় এই পলল উপকূলীয় সমভূমিতে জমা হয়ে ভূমির উচ্চতা বাড়ায়, অথচ সম্প্রতি এই প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (CEGIS)-এর সাম্প্রতিক মডেলিং অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যম মাত্রার পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ১২-১৫ শতাংশ এলাকা সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। চরম মাত্রার পরিস্থিতিতে এই সংখ্যা দাঁড়াতে পারে ২০-২২ শতাংশে।
এর ফলে বিপুল পরিমাণ জমি চিরতরে হারিয়ে যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষিজমি, বসতভিটা, ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান। ইতোমধ্যে দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের কয়েকটি দ্বীপ যেমন কুতুবদিয়া, মহেশখালী ও ভোলার কিছু অংশে জমি হারানোর প্রক্রিয়া দৃশ্যমান। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির সাথে সাথে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার ক্রমবর্ধমান অনুপ্রবেশ আরও ভয়াবহ। কারণ এটি একটি নীরব ঘাতকের মতো ধীরে ধীরে উপকূলের মাটি, পানি, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবনধারাকে বিষিয়ে তুলছে। পোর্টসমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় ১৯৭৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় নদী ও খালের পানির লবণাক্ততার তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ দশকে শুষ্ক মৌসুমে নদী ও খালের পানির লবণাক্ততা বেড়েছে ২৫০-৩৫০ শতাংশ। বিশেষত ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরের পর থেকে এই বৃদ্ধির হার আরও ত্বরান্বিত হয়েছে।

বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের তথ্য বলছে, বর্তমানে উপকূলের মোট আয়তনের প্রায় ৩৩ শতাংশ জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত। এর মধ্যে প্রায় ৬ লাখ হেক্টর জমি উচ্চ মাত্রায় লবণাক্ত (১২-১৫ ডিএস/মি), যেখানে ধান চাষ প্রায় অসম্ভব। IRRI-এর গবেষণা বলছে, লবণাক্ততার কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে ধানের ফলন হ্রাস পাচ্ছে ৫.৮ থেকে ৯.১ শতাংশ। আমন মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে লবণাক্ত পানি জমিতে ঢুকে ধানের ব্যাপক ক্ষতি করছে। ২০২০ সালের আম্ফান ঘূর্ণিঝড়ে শুধু সাতক্ষীরা জেলায় প্রায় ২.৫ লাখ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়। উপকূলের প্রায় ২ কোটি মানুষ লবণাক্ততার কারণে নিরাপদ পানীয় পানির অভাবে ভুগছেন। সরকারি হিসাব বলছে, উপকূলীয় অঞ্চলের ৭০ শতাংশ গভীর নলকূপের পানিতে বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ততা পাওয়া গেছে। বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় শুষ্ক মৌসুমে মানুষকে দূরদূরান্ত থেকে পানি আনতে হচ্ছে।

ICDDR,B-এর গবেষণায় দেখা গেছে, উপকূলীয় অঞ্চলে উচ্চ রক্তচাপ, প্রিক্ল্যাম্পসিয়া ও অন্যান্য প্রজনন স্বাস্থ্য সমস্যার হার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের তুলনায় ৩০-৪০ শতাংশ বেশি। এর প্রধান কারণ উচ্চ লবণযুক্ত পানি পান করা ও খাদ্যাভ্যাস। এছাড়া এসব স্থানে ত্বকের রোগ, ডায়রিয়া ও কলেরার প্রাদুর্ভাবও বেশি। বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের ৪ কোটি ৩০ লাখ মানুষ, যারা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১-২ মিটার উচ্চতায় বসবাস করে, তারা প্রতিনিয়ত এক অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি। জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশন (IOM)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ৭০ লাখ মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যার মধ্যে ৮০ শতাংশই উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দা। ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদীভাঙন ও লবণাক্ততার কারণে আরও ১ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

২০২০ সালের সুপার সাইক্লোন আম্ফানের পর সরকারি হিসেবে উপকূলের ১০টি জেলায় ৫১ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়, আরও ১.৫ লাখ ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ৪.৫ হাজার হেক্টর চিংড়ি ঘের ভেসে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে মৃতের সংখ্যা ছিল ৩,৪০৬ জন, আর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ৯০ লাখ মানুষ। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ যখন বারবার ঘরবাড়ি হারায়, তখন তাদের জীবনের সঞ্চয়, স্বপ্ন, সামাজিক অবস্থান সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরমুখী মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও পটুয়াখালীর বিভিন্ন গ্রামে দেখা গেছে, প্রায় প্রতিটি পরিবারের অন্তত একজন সদস্য ঢাকা বা অন্য কোনো শহরে অভিবাসী হয়েছেন। উপকূলীয় অঞ্চলে নারী ও বৃদ্ধরা সবচেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়ে যায়। ঘূর্ণিঝড়ের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়া থেকে শুরু করে পানির সংকট মোকাবিলার ক্ষেত্রেও তারা অনেক ভুগে থাকেন। উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের মধ্যে সুন্দরবন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বন বিভাগ ও CEGIS-এর গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত ৩০ বছরে সুন্দরবনের দক্ষিণ অংশের প্রায় ৫-৭ শতাংশ ম্যানগ্রোভ বন সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে বা লবণাক্ততার কারণে প্রজাতি পরিবর্তন ঘটেছে। সুন্দরী গাছ, যা থেকে নামকরণ হয়েছে, তার অস্তিত্ব সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে। লবণাক্ততা বাড়ার সাথে সাথে সুন্দরী গাছের পাতায় রোগ দেখা দিচ্ছে এবং মৃত্যুহার বাড়ছে। বনভূমি ধ্বংস হওয়ার সাথে সাথে বাঘের আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। সর্বশেষ জরিপে (২০২৪) বাংলার এই অংশে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি পাওয়া গেছে, যা আগের চেয়ে কিছুটা বাড়লেও আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ার কারণে ভবিষ্যতে এই সংখ্যা কমতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততার পরিবর্তনের কারণে ইলিশ মাছের প্রজনন ও অভিবাসন পথে পরিবর্তন আসছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, বিগত ২০ বছরে ইলিশের প্রধান প্রজনন এলাকা দক্ষিণে সরে গেছে, ফলে জেলেদের ধরতে অসুবিধা হচ্ছে। এছাড়া প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের প্রবাল বাস্তুতন্ত্র সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির কারণে ব্লিচিং-এর ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশ এই জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বিশ্বের অন্যতম পথিকৃৎ দেশ। সরকার, এনজিও এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে সমস্যার স্থায়ী সমাধান এখনও অনেক দূরে। এজন্য যেসব পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন—কমিউনিটি ভিত্তিক টিডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হবে। এটি মূলত জলাবদ্ধতা নিরসন ও ভূমির উচ্চতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। এছাড়া পলি জমার হার প্রতি বছর ২-৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বাড়াতে পারে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে। সর্বোপরি এর খরচ কম এবং টেকসই। এরপর লবণাক্ততা সহনশীল ফসল উদ্ভাবন ও সম্প্রসারণের কাজ হাতে নেওয়া যেতে পারে। ইতোমধ্যে BRRI ধান-৪৭, BRRI ধান-৫৩ ও বিনা ধান-৮ ও ১০ ইত্যাদি লবণাক্ততা সহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবন করা সম্ভব হয়েছে। সবজির মধ্যে কলমি শাক, পুঁই শাক ও লাল শাক লবণাক্ততায় ভালো জন্মে বলে গবেষণায় দেখা গেছে। লবণাক্ততার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সঠিক পানি ব্যবস্থাপনা। উপকূলীয় অঞ্চলে বর্ষাকালে পানি জমিয়ে রাখা, দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের নদীতে স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়ানোর জন্য টিপাইমুখ বাঁধের বিকল্প খোঁজা এবং খাল পুনঃখননের মাধ্যমে স্বাদু পানি ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া দরকার। এরপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হলো অভিযোজন তহবিল ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা। সম্প্রতি GCA ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) যৌথভাবে ২২টি উপকূলীয় পৌরসভায় জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে একটি প্রকল্প নিচ্ছে। সেখানে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার, খাল পুনঃখনন ও জলাভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও লবণাক্ততা প্রতিরোধের চেষ্টা চলছে। একইসাথে, অভিযোজন কৌশলে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। খুলনা ও সাতক্ষীরায় ইউএনডিপি’র সহায়তায় বাস্তবায়িত একটি প্রকল্প নারীদেরই এই সংকট মোকাবিলার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। পঁচিশ হাজারের বেশি নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার সেখানে লবণাক্ত-সহনশীল ফসল চাষ, কাঁকড়া মোটাতাজাকরণ এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের কাজে নেতৃত্ব দিচ্ছে। একই সাথে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে নারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে, যা অভিযোজন কৌশলে নারীদের অংশগ্রহণকে কার্যকর করেছে।

“ল্যান্ড অব বেঙ্গল” নামে খ্যাত এই বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলের স্বাভাবিক চিত্র গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এই সংকট মোকাবেলার দায়িত্ব শুধু সরকারের একার নয়; সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকেও সচেতন হতে হবে। উন্নয়নের নামে শুধু প্রকল্প গ্রহণ না করে যুক্তি ও প্রভাব বিশ্লেষণ করতে হবে যেন প্রকৃতির ক্ষতি না হয়। সবশেষে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার সমন্বয়ে আমরা সমস্যামুক্ত সমুদ্র উপকূল দেখতে চাই। এর ফলে সেখানকার মানুষেরও মৌলিক অধিকার পূরণ হওয়া সম্ভব হবে।
 
লেখক,
লাবনী আক্তার শিমলা
শিক্ষার্থী, গণিত বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেইল : [email protected]

আরও পড়ুন